Categories
প্রবন্ধ

সুকান্ত ভট্টাচার্য: বাম রেনেসাঁসের দিশারী কবি – কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

রেনেসাঁস কিংবা নবজাগৃতি (সম্পর্কিত আগ্রহ-উদ্দীপনা) নিয়ে বাংলাদেশে তেমন বেশি লেখালেখি কিংবা সমীক্ষা হয়নি। বাংলাদেশে জাতিগঠনের যে প্রক্রিয়াটি রেনেসাঁসের অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল মনে হয়, তার হালফিল অবস্থা আমাদের জানা নেই। চারদিকে এ উপলব্ধিরও অভাব যে জাতি গঠন না এগোলে, বাংলাদেশে এমনকি বুর্জোয়া বিকাশও আগাবে না। তবে, নানাভাবেই ছোট হয়ে এসেছে যে পৃথিবী, গোলোকায়িত, তাতে সমাজবিকাশের ক্লাসিক্যাল পর্যায়গুলোকে আর আলাদা কিংবা সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যাবে না। এরা মিশ্র এবং পি- অবস্থায়ই বিভিন্ন গতিতে এগুচ্ছে, এগোবে। রূপায়ণকারী শক্তি হিসেবে পুঁজির সামনে কোনো কিছুই জোর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, পারছে না। এভাবেই ঔপনিবেশিক শাসন আমলে পশ্চিমের বিন্যাসে-আদলে ঘটেছিল এক-ধরনের রেনেসাঁস, মর্ডানিজম; এসেছিল মার্ক্সবাদ কিংবা সোশ্যালিজম-কমিউনিজমের দর্শন-রাজনীতি-আদর্শ। বৃটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের কেউ-কেউ পর্যন্ত বাম সহানুভূতিকে ধারণ করেছেন; রাজনৈতিক কর্মী এবং বন্দীদেরে সাহায্য করেছেন। আবার বৃটেনে উচ্চ শিক্ষা নিতে গিয়েও অনেকে বামপন্থী হয়ে ফিরেছেন। শেষ দিন পর্যন্তও বাংলাদেশের বন্ধু জ্যোতি বসু যেমনটা। তখন বাম রাজনৈতিক কর্মকা–সংগঠনের ধারায় সাংস্কৃতিক সংগঠন, আন্দোলনও গড়ে ওঠে এবং বেশ প্রভাব এবং শক্তি অর্জন করে। ১৯৪৬-এ মুম্বাইর নৌবিদ্রোহ ছিল বৃটিশ শাসকদের ওপর অত্যন্ত সিদ্ধান্তমূলক আঘাত, এবং এর সংগঠন-আয়োজনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাও ছিল সিদ্ধান্তমূলক। কমিউনিস্ট পার্টির তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন- তথা মিত্র-শক্তি-ঘেষা লাইন নিয়ে বিতর্ক এবং আলোচনা-সমালোচনা নেই, মোটেই তা নয়; তবে, সামগ্রিক গুরুত্ব এবং প্রভাবের বিচারে কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অংশকেও একটি ক্ষুদ্র এবং বাম রেনেসাঁস হিসেবে অভিহিত করা যায় কিনা, এ-ভাবনা আমার বহুদিনের। সেই ‘বাম রেনেসাঁস’ ছাপাঙ্কিত যুগের প্রবর্তক কবি কারা? নিঃসন্দেহে সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁদের অন্যতম।

সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মেছিলেন কলকাতায় ১৩৩৩ সালের ৩১ শ্রাবণ; তাঁর পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গের, কোটালীপাড়ার। দারিদ্র্য এবং দুঃখকষ্টের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পরিস্থিতি ও ঘটনার মধ্যেই তাঁর পিতা-পিতামহ কলকাতার জীবন শুরু করেন। একটি বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারে, পঠন-পাঠন এবং সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশে সুকান্ত বড় হন। শৈশবেই তিনি মাকে হারান। যে রানীদির কোলে-কোলে তিনি বড় হয়েছিলেন, তিনিও আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবেই নিঃসঙ্গতা এবং অযতেœর কিছু উপাদান এসে উপস্থিত হয়; বন্ধু অরুণাচল বসুর মা সরলা বসু সুকান্তের কাছে চলে আসেন; শূণ্যতা-পূরণেই আসে সাহিত্যচর্চা এবং হয়তো বা রাজনৈতিক সক্রিয়তা। সর্বোপরি সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল, যার উৎস এবং কারণ নিয়ে আলোচনা-তর্ক-বিতর্কে গোটা বর্হিবিশ্ব সহসাই উপস্থিত হতো। দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তো ছিল খোদ কলকাতাতেই। ভয়াবহতা-নির্মমতার অভিজ্ঞতা দ্রুত এবং সহজে এসেছে, তার পেছনে বিশ্বের প্রেক্ষাপট। এক চমৎকার সংশ্লেষণে কর্মী এবং কবি মিলিত হয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের একক জীবনে; কমিউনিস্ট পার্টির “কিশোর বাহিনী”র কাজকর্ম তাকে জনজীবনের মাঝখানে ছুঁড়ে দিয়েছিল। বলা যায়, জীবনাভিজ্ঞতার কোনো অভাবই অপূর্ণ থাকে নি, সম্ভব হয় “কৃষাণের জীবনের”, “নৈকট্য”, “কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা অর্জন”। এভাবেই প্রস্তুত হতে থাকেন অগ্রসর বাম রেনেসাঁসের দৃষ্টান্ত-মানুষ সুকান্ত; যদি না শুধু অকাল মৃত্যু বাড়িয়ে দিতো তার কড়াল গ্রাস। তদসত্ত্বেও ২১ বছরের কবির জীবনই কি কম সার্থক, কম ফলপ্রসূ? তিনি একটি সাহিত্যিক ধারার প্রায় সর্বাগ্রগণ্য প্রতিনিধি। সাহিত্যের একটি যুগ-পর্যায়েরও। একটি আদর্শকে ধারণ করেছেন বলে নয়, তাকে সাহিত্যিক ভাষা এবং প্রকাশ দিয়েছিলেন বলেই, অকালমৃত্যু সত্ত্বেও, তাঁর যে সাফল্য, আমরা তার উচ্চ মূল্য দেখি। সাহিত্য এবং চিন্তার ইতিহাসে স্থাপন করেই সেটা সম্ভব। আমি সেজন্যেই রেনেসাঁস এবং বাম রেনেসাঁস-এর প্রসঙ্গ তুলেছিলাম।

রেনেসাঁসকে ইউরোপের ক্ষেত্রে মর্ডানিটিও বলা হয়ে থাকে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিপ্লব তার অংশ। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছাড়পত্র কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার নাম “ইউরোপের উদ্দেশ্যে”। দেখা যাচ্ছে প্রচলিত দেশপ্রেম নয়, ইউরোপের সাথে তুলনার বেলায় সুকান্ত ঋতুগত কিংবা নৈসর্গিক ব্যবধান ছাড়িয়ে বেশি তাকাচ্ছেন সমাজ বিকাশের পর্যায়ের অংশটির দিকেÑ সেখানে, উপনিবেশিক দখল, ইত্যাদি সত্ত্বেও, ইউরোপের যে একটি অগ্রবর্তী অবস্থান রয়েছে, সেই দৃশ্যের দিকে। স্বদেশে দারিদ্র, পশ্চাৎপদতা এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ছবিটি রয়েছে। কিন্তু, উপনিবেশবাদ যে একটি অগ্রসর ব্যবস্থার শাখা, শেষ পর্যন্ত কবির সেই উপলব্ধিটি ধরা পড়ে:

এখানে সেখানে ফুল ফোটে আজ তোমাদের দেশে
কত রঙ, কত বিচিত্র নিশি দেখা দেয় এসে।
ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েছে কত ছেলেমেয়ে
এই বসন্তে কত উৎসব কত গান গেয়ে।

মনে পড়ছে সুকান্তের কবিতার হাঁকিয়ে-দেয়া লাইন, “শোনরে মালিক, শোনরে মজুতদার! তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়–হিসাব কি দিবি তার?” এসব লাইন এখন আমাদের সামষ্টিক দ্রোহ-চেতনার অংশে পরিণত, কিন্তু এমন কবিতা লেখার জন্য সুকান্তকে ভূগোল কিংবা ইতিহাসের কোনো অন্ধ বিভ্রান্তির অবস্থানে দাঁড়াতে হয়নি। “ইউরোপের উদ্দেশ্যে” নামক কবিতায় এরপর তুলনা করে চারটি লাইনে তিনি বলেছেন স্বদেশ সম্পর্কে:

এখানে তো ফুল শুকানো। ধূসর রঙের ধূলোয়
খাঁ খাঁ করে সারা দেশটি, শান্তি গিয়েছে চুলোয়
কঠিন রোদের ভয়ে ছেলেমেয়ে বন্ধ ঘরে
সব চুপচাপ: জাগবে হয়তো বোশেখি ঝড়ে।

কবিতায় এর পরের দুটো লাইন আমাদের আলোচনার পক্ষে আরো তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপের উদ্দেশ্যে সুকান্ত সপ্রশংসভাবে বলেছেন, “অনেক খাটনি অনেক লড়াই করার শেষে/চারিদিকে ক্রমে ফুুলের বাগান তোমার দেশে।” ইউরোপের অংশে সুকান্ত মে মাসকে বেছে নিয়েছিলেন প্রতীকি সময় হিসেবে, আর বাংলার ক্ষেত্রে বৈশাখকে:

এদেশে যুদ্ধ, মহামারী, ভুখা জ্ব¡লে হাড়ে হাড়েÑ
অগ্নিবর্ষী গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে
বেপরোয়া প্রাণ; জমে দিকে দিকে আজ লাখে লাখ-
তোমাদের দেশে মে মাস, এখানে ঝড়ো বৈশাখ ॥

নানা কারণ এবং মনোভাব ইউরোপ সম্পর্কে যে অন্ধ এবং প্রায়-শতভাগ নেতিবাচক মনোভাব এখন তৈরি করছে, তার সাথে সুকান্ত ভট্টাচার্যের এ-কবিতার অবস্থানের ব্যবধান নিয়ে আমরা কি ভাববো? এডওয়ার্ডের সাঈদের রচনার ভুল পাঠও এজন্যে দায়ী। একালের প্রায় সব থিওরি আর ডিসকোর্সই তো শুদ্ধ মার্ক্সবাদ এবং জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে গেছে, কতগুলো খ-িত আর অনৈতিহাসিক মনোভাবে ঠেলে দিয়েছে মানুষকে। বিপ্লবী কবি হিসেবে পরিচিত সুকান্তের ইউরোপ-বিচার কি আমাদের সংবিত ফেরাবে? এডওয়ার্ড সাঈদের প্রসঙ্গ আসাতে আমাদের নজর যেতে পারে সুকান্তের “সিপাহী বিদ্রোহ” কবিতাটির প্রতি। সেখানে দেখা যাচ্ছে ঐ ঐতিহাসিক ঘটনার মার্ক্স-প্রদত্ত বিশেষণটিই হাজির করেছেন কবি। একে বলেছেন “স্বাধীনতার প্রথম লড়াই”:

নানা জাতের নানান সেপাই গরীব এবং মুর্খ :
সবাই তারা বুঝেছিল অধীনতার দুঃখ;
তাই তো তারা স্বাধীনতার প্রথম লড়াই লড়তে
এগিয়েছিলো, এগিয়েছিলো মরণ বরণ করতে।

কিন্তু, ইতোমধ্যেই তো সাঈদ এবং তাঁর ভুল পাঠের সৌজন্যে কার্ল মার্ক্সকেও আমরা ওরিয়েন্টালিস্ট বুদ্ধিজীবী ঘোষণা করেছি। ‘থিওরি’র থিওরি কিংবা রাজনীতি ঠিক এখানটাতেই। বাংলাদেশে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির যে কথা উঠতে-বসতে বলছি আমরা, তা তো বাৎকে বাৎ হয়ে থাকে যখন মার্ক্সকেও পরিত্যাজ্য বলে দেয়া যায়। থিওরি কিংবা সাঈদ সম্পর্কে উদ্দীপনার রহস্য এখানেই। বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ যে তারা মার্ক্সবাদী হিসেবে পরিচিত সুকান্ত ভট্টাচার্যকে স্মরণ করছেন। মার্ক্সবাদী কিংবা একটি রাজনৈতিক আদর্শের কবি হওয়ার কারণে যারা সুকান্তকে অবজ্ঞা করেন, তারা আরো অনেক কিছুই বলতে কিংবা করতে পারেন। কিন্তু “ছাড়পত্র”-এরই “ঐতিহাসিক” নামের প্রায়-ঐতিহাসিক এক কবিতায় সুকান্ত বোধ হয় এদের উদ্দেশ্যেই লিখেছিলেন গভীর দার্শনিকতা-কাব্যিকতার ক’টি অমোঘ লাইন। পায়গম্বরিক মনে হয় এ কবিতাকে; গভীর এবং শতভাগ যে বিবাদমানতার জন্যে বাংলাদেশ অনেক খ্যাতি পেয়েছে, এ-কবিতায় সেটাই সুকান্তের মূল বিষয়। তিনি লিখেছিলেন, “তোমাদের ঐক্যহীন বিশৃঙ্খলা দেখে/বন্ধ হয়ে গেছে মুক্তির দোকানের ঝাঁপ।” ঐক্যের তাগিদ এখানে বারবার এসেছে, “ইতিমধ্যে তোমাদের বিবাদমান বিশৃঙ্খলার ভিড়ে/ মুক্তি উঁকি দিয়ে গেছে বহুবার।” সবশেষে লাইনগুলো অসামান্য:

আমি ইতিহাস, আমার কথাটা একবার ভেবে দেখো,
মনে রেখো, দেরি হয়ে গেছে। অনেক অনেক দেরি।
আর মনে করো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র,
নদীর ধারায় আছে গতির নির্দেশ,
অরণ্যের মর্মর ধ্বনিতে আছে আন্দোলনের ভাষা,
আর আছে পৃথিবীর চিরকালের আবর্তন। (পৃ: ১২৫)
(সুকান্তর সমগ্র কবিতা, মুহম্মদ আবদুল হাফিজ সম্পাদিত)

এই মহৎ কবিতাকে কবির কোনো রাজনীতি কিংবা অকালমৃত্যুর মতো কবি-জীবনের কোনো ঘটনার আলোতে দেখার প্রয়োজন নেই। এরূপ কোনো বিবেচনার ঊর্দ্ধেই নিশ্চিত এর মহত্ত্ব, কাব্যিকতা। শুধু যদি বাংলাদেশে আমরা অন্তহীন বিভাজনের উৎসগুলো নির্ণয় ক’রে, সততা আর আন্তরিকতার সাথে সেগুলোকে অতিক্রম করতাম।
ইউরোপ কিংবা পশ্চিম সম্পর্কে শুধু নয়, রবীন্দ্রনাথের মতো ঐতিহ্য সম্পর্কেও এখানে বলা যেতে পারে। আমরা রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বলছি; সে সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর আত্মোপলব্ধির উচ্চারণকে প্রসঙ্গক্রমে উদ্ধৃত করেছি। কিন্তু বিপরীত, অর্থাৎ সুকান্তের, দিক থেকে দেখে কি কোনো উল্লম্ফন পাওয়া যায়? কোনো মুর্ত্তি-ভাঙ্গার ঘটনা? “রবীন্দ্রনাথের প্রতি” নামে সুকান্তের যে কবিতা, সেখানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতার বোধের কোনো অভাব নেই কিংবা সশ্রদ্ধ অবলোকনের:

এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি
প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি
এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি,
নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রুকুটি।
এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে
তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে ।
………………………………………………
তবুও ক্ষুধিত দিন ক্রমশ সা¤্রাজ্য গড়ে তোলে।
গোপনে লাঞ্চিত হই হানাদারী মৃত্যুর কবলে;
যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তোমার সৃষ্টিকে
এখনো প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে।
(পৃঃ ৯১ ঐ)

শুরুতে আমি যে রেনেসাাঁস ধারণাটির উল্লেখ করেছিলাম, অস্বীকার করা যাবে না যে উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথ তার অন্যতম ধারক, আর মডার্নিটির সেই বৃহৎ-পরিধি প্রক্রিয়ারই এক উজ্জ্বল প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন সমাজতন্ত্রীরা, সুকান্তগণ। আর এখন বিশ্বব্যাপী থিওরি, ডিসকোর্স ইত্যাদির শক্তিতে মডার্নিটির সকল প্রকল্পকেই নস্যাৎ করার যে আয়োজন, ধর্মান্ধতা রক্ষণশীলতারও তো তাতে পোয়া বারো। সেখানে রবীন্দ্রনাথের পোস্টমডার্নিস্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে উৎসাহ থাকবে বেশি। সুকান্তে থাকবে সামান্য একাডেমিক ধরনের আগ্রহ। মূল ব্যবস্থাটাকে বাঁচিয়ে ক্ষুদ্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচার- বিশ্লেষণ চলছে। “রবীন্দ্রনাথের প্রতি” কবিতায়ই যে সামগ্রিক সংগ্রামের ছবি আঁকেন সুকান্ত, বড় পরিবর্তনের, তার আয়োজনের লক্ষণÑচিহ্ন কোথাও নেই। মার্ক্সবাদের মতো গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ এখন প্রায়-বাতিল। বড় পরিবর্তন চলবে না; কারণ চালাতে হবে “বড়োমানুষী”। সুকান্ত ভট্টাচার্যের মিঠেকড়া নামের শিশুতোষ কবিতার বইয়ের “এক যে ছিল” নামে যে কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, সেখানেই আছে এই “বড়োমানুষীর” ধারণা। রবীন্দ্রনাথের বড়ো মানুষ হওয়া নিয়ে সুকান্ত লিখেছিলেন,

বড়োমানুষীর মধ্যে গরীবের মতো মানুষ,
তাই বড়ো হয়ে সে বড়ো মানুষ না হয়ে
মানুষ হিসেবে হলো অনেক বড়ো।
কেমন করে? সে প্রশ্ন আমাকে করো না।

বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করি সুকান্তের ছাড়পত্র কাব্যের “বিবৃতি” নামের একটি কবিতায় পর-পর দু’টো স্তবকে রয়েছে এ যুগে আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা প্রকাশের কাজে খুব বেশি ব্যবহৃত দুটো শব্দ: “জঙ্গী” এবং “জেহাদ”। এবং স্তবক দুটো এখন আমি উদ্ধৃত করলে পাঠকই বুঝতে পারবেন অন্তবর্তী সময়ে আমাদের ভাবনা-জগত কোন্ দিকে কতোটা পাল্টে গিয়েছে কিংবা টাল খেয়েছে। এ প্রসঙ্গে এই উদাহরণের সাহায্যেই আশা করি আমি বোঝাতে সক্ষম হবো কিভাবে মডার্নিটির ভাবনা-পরিবেশ ধর্মাশ্রিত হয়েও বদলে গিয়েছে। এই বদলের শক্তি একদিকে অনেকগুলো ‘পোস্ট’ ইজম, অন্যদিকে ধর্ম-প্রধান পরিস্থিতি। এরা পরস্পরের সহযোগী হয়েছে এনলাইটেনমেন্ট কিংবা মডার্নিটিকে পেছনে ঠেলে দিতে। এই হাত-ধরাধরাটি স্পষ্ট ছড়িয়ে আছে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের পরিচিত সব ঝোঁক এবং মনোভাবের মধ্যে। দেশ এবং বিশ্বপরিসরের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক এবং কর্মকা-ের মধ্যেও। পাঠক লক্ষ্য করুন সুকান্ত কিভাবে উল্লিখিত দুটো শব্দ “জঙ্গী” এবং “জেহাদ”কে ব্যবহার করেছিলেন এবং এখন আমরা এগুলোকে কোন্ অনুষঙ্গে ব্যবহার করি:

অভুক্ত কৃষক আজ সূচীমুখ লাঙলের মুখে
নির্ভয়ে রচনা করে জঙ্গী কাব্য এ মাটির বুকে।
আজকে আসন্ন মুক্তি দূর থেকে দৃষ্টি দেয় শ্যেন।
এদেশে ভা-ার ভরে দেবে জানি নতুন য়ুক্রেন।
নিরন্ন আমার দেশে আজ তাই উদ্ধত জেহাদ,
টলোমলো এ দুর্দিন, থরোথরো জীর্ণ বনিয়াদ।
তাই তো রক্তের স্রোতে শুনি পদধ্বনি
বিক্ষুব্ধ টাইফুন-মত্ত চঞ্চল ধমনী:

এখানে উদার নির্দ্বিধায় এবং কিছুটা নজরুল-ঐতিহ্যের শক্তিতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের সংগ্রামী কাব্যভাষা পাঠককে যে চেতনায় উত্তীর্ণ করে, সেটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি বহুদিন। এ শব্দ দু’টোকে এখন আর তাদের ঐ পুরনো দ্যোতনা এবং অনুষঙ্গে ব্যবহার করাটা কঠিন। এখন এরা অধিকাংশটাই অবিবেচনা এবং আতঙ্কের দ্যোতক, পরিত্যাজ্য কোনো কিছুর। মডার্নিটির পরিম-লটা হারিয়ে যাওয়াতেই এমনটা ঘটেছে। কিন্তু, এই ক্ষতির ঘটনা এবং পরিস্থিতিকে লক্ষ্য করা হয় না। অন্য স্তরে/ পর্যায়ে যে বিবেচনাগুলো চলে, তারা খ-িত, সঙ্কীর্ণ। বাম কিংবা শ্রেণী-চেতনার কর্মকা-ের ভিত্তি যে মানবতাবাদ, সেটাই সেখানে অনুপস্থিত। এরূপ পরিবেশে যে যান্ত্রিক মার্ক্সবাদ কর্ষণের চেষ্টা হয়, পাকিস্তান-সময়ে আমরা তার কিছু নমুনা দেখেছিলাম। এখনকার জঙ্গীবাদীদের মধ্যেও অনেক সা¤্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার উপাদান দেখেন, কিংবা ’৭১- এর মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও বলেন জঙ্গীবাদী/ সন্ত্রাসবাদী।

ক’দিন আগে ঢাকার অলিঁয়স ফ্রাঁসেজে র‌্যাঁবোর কবিতা নামের একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সুকান্ত ভট্টাচার্যের নামটি আলোচনায় উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নিয়ে আমিই প্রথমে বলতে চাইলাম যে প্যারি কমিউন ধরনের ঘটনার তাৎপর্য নিয়ে লেখা আর্তুর র‌্যাঁবোর কবিতাতে দ্রোহ এবং প্রতিবাদের উপদানকে লক্ষ্য না-করাটা দুঃখজনক। অনেকেই বলতে চাইলেন সুকান্ত, কিট্স্ এবং র্যাঁবোর মধ্যে রয়েছে মেরু-দূরত্ব। একজন বললেন যে সুকান্ত সুররিয়ালিস্ট-সিম্বোলিস্ট র‌্যাঁবোর উচ্চতার কাছাকাছিও যান না। এই অদ্ভুত প্রবণতাটি সম্পূর্ণ নতুন নয়। সরাসরি এবং প্রত্যক্ষ অর্থপূর্ণতার সকল কবিতাকে শ্লোগান ঘোষণা করে বাতিল করার এই মনোভঙ্গীটি স্বাধীন বাংলাদেশেও ক্রমশ জোরদার হয়েছে। সামরিক শাসন এবং অন্য রাজনৈতিক অধোগমনের পাশাপাশি কবিতা ক্রমশই তার জনলগ্নতা এবং স্পষ্টার্থকতাকে হারিয়েছে। আবারও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে এতে মদদ এসেছে ‘পোস্ট’ ইজমগুলোর দিক থেকে। এখানে ভাবাখানা হচ্ছে আদর্শ কবিতা হবে শব্দের অর্থহীন সমাবেশ; কবিতা যতো স্বল্পার্থক হবে কিংবা শুধুই শৈলীর ব্যয়াম, ততোই তা আদর্শস্থানীয়। কিংবা ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন নিমগ্নতা যতো শতভাগ পরিবেশিত হবে ততোই তা আদর্শ শিল্প কিংবা সাহিত্য। র‌্যাঁবোরা যে সুররিয়ালিস্ট-সিম্বোলিস্ট হয়েও সমাজলগ্ন থাকতে পেরেছিলেন, অস্তিত্ববাদী হয়েও যা সম্ভব হয়েছে জাঁ পল সার্ত্র কিংবা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর পক্ষে, তা অনেকে মনে রাখেন না। সমাজব্যবস্থা নামক কারাগারে যে অস্তিস্ত¡¡বাদী দুর্দশা তৈরী হতেই পারে, তার হতাশা-নৈঃসঙ্গও, এ সত্যকে কি যান্ত্রিক আশাবাদের অস্ত্রের সাহায্যে অস্বীকার করতেই হবে? এই বিতর্কের জন্যে প্রাসঙ্গিক কিছু উপাদান পাওয়া যায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি ভিন্ন ধরনের চিঠিতে; বন্ধু অরুণাচল বসুর মা সরলা বসুকে লেখা একটি চিঠির একাংশ নি¤œরূপ:

বাস্তবিক, আমি কোথাও চলে যেতে চাই, নিরুদ্দেশ হয়ে মিলিয়ে যেতে চাই …কোনো গহন অরণ্যে কিংবা অন্য যে কোনো নিভৃততম প্রদেশে; যেখানে মানুষ নেই, কেবল সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট-মনা হিঃস্র আর নিরীহ জীবেরা, আর অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। এতোরও দরকার নেই, নিদেনপক্ষে আপনাদের ওখানে যেতে পারলেও গভীর আনন্দ পেতাম, নিষ্কৃৃৃতির বন্য আনন্দ, সমস্ত জগতের সঙ্গে আমার নিবিড় অসহযোগ চলছে। এই পার্থিব কৌটিল্য আমার মনে এমন বিস্বাদনা এনে দিয়েছে, যাতে আর আমার প্রলোভন নেই জীবনের ওপর। … এক অননুভূত অবসাদ আমায় আচ্ছন্ন করেছে। সমস্ত পৃথিবীর ওপর রুক্ষতায় ভরা বৈরাগ্য এসেছে বটে। কিন্তু ধর্মভাব জাগেনি। আমার রচনাশক্তি পর্যন্ত ক্ষীণ হয়ে এসেছে মনের এই শোচনীয় দুরবস্থায়। প্রত্যেককে ক্ষমা করে যাওয়া ছাড়া আজ আর আমার অন্য উপায় নেই। আচ্ছা, এই মনোভাব কি সবার মধ্যেই আসে এক বিশিষ্ট সময়ে?

এখানে একটি জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ পাচ্ছি, এক বিশিষ্ট বামপন্থীর জীবন থেকে, প্রত্যাহার ও হতাশার মনোভাবের। আধুনিক ইউরোপের অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবীর জীবনেও ব্যর্থতা-অসহায়ত্বের পরিস্থিতিতে এসেছে নৈরাজ্যবাদী-উচ্ছৃঙ্খল-ভাববাদী আচরণ, কর্মকা-, লেখালেখি। সেখানে ডাডাইজম, সুররিয়ালিজমের মতো সাড়া-জবাবকে দেখামাত্রই ক্ষয়িষ্ণু-নেতিবাচক বলে দেয়ার সুযোগ কতোটা? মার্ক্স ধর্মকে পর্যন্ত বলেছিলেন “হৃদয়হীন পৃথিবীর হৃদয়”, “নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘঃশ্বাস” এবং শেষ পর্যন্ত “জনগণের আফিম”। এরূপ প্রতিটি অভিধাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গভীরভাবে বিবেচ্য। সুকান্ত অবশ্য ধর্মে পৌঁছে যাননি, কিন্তু তিনি তা উল্লেখ করায় বোঝা যায়, তার সম্ভাবনাটা তিনি বাতিল করেন নি। হৃদয়হীন পৃথিবীকে সহৃদয় ক’রে গড়ে তোলার আয়োজনে যান্ত্রিক মনোভাবের ক্ষতি বৃহৎ। সামগ্রিকতায় দেখারও কোনো বিকল্প নেই। রেনেসাঁস এবং সংশ্লিষ্ট সব হচ্ছে মূল্যবানকে ফিরিয়ে আনার আয়োজন, সমগ্রকে ফিরে পাওয়া। সুকান্তকে ফিরে পাওয়ার এই আয়োজনে লক্ষ্য করে আমাদের এই বিস্ময় যে “অলক্ষ্যে” কবিতায় তিনি নি¤œরূপ লিখেছিলেন:

আমার মৃত্যুর পর কেটে গেল বৎসর বৎসর;
ক্ষয়িষ্ণুু স্মৃতির ব্যর্থ প্রচেষ্টাও আজ অগভীর,
এখন পৃথিবী নয় অতিক্রান্ত প্রায়ান্ধ স্থবির;
নিভেছে প্রধূ¤্রজ্বালা, নিরঙ্কুশ সূর্য অনশ্বর;
স্তব্ধতা নেমেছে নির্ভীক তীক্ষ্মস্বর —
অথবা নিরন্ন দিন, পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা;
উদ্ধত বর্জ্যও ভয়ে নিঃশব্দ মৃত্যুও আনাগোনা,
অনন্য মানবসত্তা ক্রমান্বয়ে স্বল্পপরিসর।
গলিত স্মৃতির বাষ্প সেদিনের পল্লব শাখায়
বারম্বার প্রতারিত অস্ফুট কুয়াশা রচনায়;
বিলুপ্ত বজ্রের ঢেউ নিশ্চিত মৃত্যুতে প্রতিহত।
আমার অজ্ঞাত দিন নগণ্য উদার উপেক্ষাতে
অগ্রগামী শূণ্যতাকে লাঞ্ছিত করেছে অবিরত