Categories
প্রবন্ধ

সঙ্গীত ও রবীন্দ্রনাথ: ড. মনিরুজ্জামান

সঙ্গীতের কথা

মহেঞ্জোদাড়ো-তে নৃত্যভঙ্গিতে নারীমূর্তি ও সঙ্গীতবাদ্যাদির চিহ্ন পাওয়া গেলে প্রমাণ হয় প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ থেকেই এই উপমহাদেশে সঙ্গীত-চর্চা হয়ে আসছে। তবে তখনও বহিঃসংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ সংস্কৃতি নিরঙ্কুশ নয়, তাই সংস্কৃতিতে-সংস্কৃতিতে মিলন হয়,-তাকেই বলে সংস্কৃতি-সম্পূরণ। যেমন ভাষায়, তেমন সঙ্গীতে, তেমন অন্যান্য ক্ষেত্রেও।

সঙ্গীত একটি মিশ্র বিদ্যা। তার একদেশিক বিকাশ সম্ভব কিনা তা বিতর্কের বিষয়। অপরদিকে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা সঙ্গীতের সহযোগী। শুধু সামগান বা বৈদিক ব্রাহ্মণগুলি বুঝতেই নয়, ইতিহাস, কলা ও সমাজনীতিতে সঙ্গীতের জ্ঞান সহায়ক হয়। সঙ্গীতজ্ঞ রাজ্যেশ্বর মিত্র ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সাহিত্যকে বুঝাতেও সঙ্গীতের দরকার হয়।’ আসলে সঙ্গীতের পরিধি যে কত ব্যাপক তা অনুসন্ধান ব্যতিরেকে উপলব্ধি করা যায় না। ইদানিং গঁংরপড়ষড়মু-র বিষয়ে আগ্রহ জন্মালেও তাতে শুধু বাদনতত্ত্ব, ধ্বনিসৃষ্টির জ্ঞান বা সঙ্গীতের স্বর-সুর-ধুন ও ধ্বনির বিষয়গুলিই এক-পাক্ষিকভাবে গৃহীত হতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ বীণার চেয়ে পিয়ানো ও বেহালাজাতীয় যন্ত্রমোহে তথা পাশ্চাত্য সঙ্গীত-চর্চায় কিশোরকাল অতিবাহিত করলেও নৈর্বাচনিক দৃষ্টিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ইউরোপীয় সঙ্গীতের রসভোগ প্রসঙ্গে ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে তাঁর আত্মস্বীকৃতি আছে যে, ‘আমি যথার্থই য়ুরোপীয় সঙ্গীতের রসভোগ করিয়াছি তখনই বারম্বার মনের মধ্যে বলিয়াছি ইহা রোমান্টিকÑ ইহা মানবজীবনের বিচিত্রতাকে গানের সুরে অনুবাদ করিয়া প্রকাশ করিতেছে। আমাদের সংগীতে কোথাও কোথাও সে চেষ্টা নাই যে তাহা নহে, কিন্তু সে চেষ্টা প্রবল ও সফল হইতে পারে নাই।’ (‘বিলাতি সঙ্গীত;’ জীবনস্মৃতি।) রবীন্দ্রনাথ এ কারণেই তাঁর সঙ্গীতের গৃহশিক্ষক (বিষ্ণু চক্রবর্তী প্রমুখ) অপেক্ষা নতুনদাদার অধিক সংলগ্ন ছিলেন বা হয়েছিলেন।

আবার এই কারণেই প্রশ্নও তোলা যায় শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ এই সঙ্গীতকে অন্তত যুগের প্রেক্ষিতে কোনও ‘সম্মিলিত বিদ্যা’-য় উন্নীত করে তুলতে কোনও ভূমিকা নিলেন না কেন? রবীন্দ্র-গানের ভা-ারী ও প্রধান রূপকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (মৃত্যু ১৩৪২/১৯৩৫)-কে পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে উদ্যোগহীন রইলেন কেন? রাজ্যেশ্বর মিত্র যখন বলেন, ‘সঙ্গীত শিক্ষা সম্বন্ধে (একটু) তলিয়ে দেখার মত চিন্তা ইউনিভারসিটির চিন্তানায়কদের মাথায় এযাবৎ প্রবেশ করে নি।’Ñ তখন যে স্বতঃই উৎসের দিকে মন ঘুরে দাঁড়াবে, এটা তো স্বাভাবিকই! রাজ্যেশ্বর মিত্র সঙ্গীতকারদের সামাজিক ও আর্থিকভাবে পদমর্যাদাসম্পন্ন অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করার কথাই এখানে ভেবেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘সঙ্গীতকে অবলম্বন করেই একটি পূর্ণতর ইনিস্টিটিউট স্থাপন করা যায়।’ সঙ্গীতের যে মূল্য সে অবস্থান লাভ এখনও ঘটে নি বা ঘটতে পারে নি, অথচ আমাদের সঙ্গীত আজ জগৎসভার অমূল্য সম্পদ। ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’, ‘রবীন্দ্র ধ্রুপদ’ ও সঙ্গীতের ‘রবীন্দ্র-শ্রী’ কি সে পথ সৃষ্টিতে সহায়তা করে নি? কবি সুধীন দত্ত যেমন বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ একাই আধুনিকতাকে নিয়ে এসেছেন’ সে কথার অনুকরণে সঙ্গীতের আধুনিকতা ও তার সামাজিক প্রতিষ্ঠার দিক থেকেও আমরা তেমনি করে বলতে পারি সঙ্গীত ও সঙ্গীত সহায়ক বিদ্যায় আধুনিকতা জন্ম নিয়েছে রবীন্দ্রসৃষ্টির একক কর্মোদ্যোগে। তবু কেন সঙ্গীত আজও মর্যাদার স্থান লাভে যোগ্য হয়ে উঠলো না?

সঙ্গীত প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতকারগণের হাতে সঙ্গীতের পাঠ অর্থাৎ উচ্চতর না হলেও উচ্চভব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। তাঁর অন্যতম গুরু যদুনাথ ভট্টাচার্য (‘যদু ভট্ট’) ত্রিপুরা মহারাজের দরবারেও ছিলেন এবং ত্রিপুরার সঙ্গীতকারদের সঙ্গীত ধারাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। সেই গুরু সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য (জীবনস্মৃতি) ছিল করুণ। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাকে গান শিখতে বাধ্য করায় আমার আর গান শেখা হলো না।’ যদু ভট্ট বিষ্ণুপুর ঘরানার প-িত ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ গান সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা পোষণ করতেন। এ কারণে তিনি ধূর্জ্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা দিলীপ রায় প্রমুখ সুরস্রষ্টা ও গায়কদের সাথে বহু বিতর্ক করে প্রচলিত মতের বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। হিন্দুস্থানী গানকে মৌলভিত্তি মনে করলেও এবং এই মেজাজকে উচ্চস্থান দিলেও তিনি পুনরাবৃত্তিক প্রবাহ-তত্ত্ব মানতেন না। পরিবর্তে তিনি সৃষ্টিশীলভাবে মূল প্রবাহের প্রসারণ ও সংযোজনের নব্য ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করেন। গানের পারিভাষিক শব্দ নিয়েও তাঁর ধারণা ছিল ভিন্ন। সহজ সরল ভাব ও ধ্রুপদের সরস উপস্থাপনে তিনি গানের মুক্তি ও প্রতিষ্ঠা মনে করতেন। এ বিষয়ে তাঁর চিন্তার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় তাঁর সঙ্গীত বিষয়ক নিবন্ধ ও মন্ত্যবাদির সংকলন ‘সঙ্গীতচিন্তা’ (১৩৭৩) গ্রন্থে। কুড়ি বছর বয়সেই সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চিন্তার কথা আমরা জানতে পারি। তাঁর প্রথম জীবনের সেই বক্তৃতায় (১৮৮১ কলকাতা মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে বেথুন সোসাইটির আমন্ত্রণে প্রদত্ত ও পরে ‘ভারতী’তে প্রকাশিত)। কবি পুরনো ধারার গানের সমালোচনা করেন এবং গানের ‘ভাবতন্ত্রে’র কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ওস্তাদবর্গ ভীষণ মুখশ্রী করিয়া গলদঘর্ম হইয়া গান শুরু করেন।’ এই বক্তব্যে যদুভট্টের প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্যের সাথে আমরা মিল লক্ষ্য করতে পারি। সঙ্গীতে ভাব প্রকাশ ও ভাব প্রতিষ্ঠার কথা রবীন্দ্রনাথই প্রথম বলেন। কথা সুর ও রাগের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও সমপাতনেই তা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন। কথাকে বাদ দিয়ে ‘গলদঘর্ম’ ভাবে নিংড়ানো সুর আর যাই হোক সঙ্গীতের প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়া ব্যাতীত আর কিছুই হয় না। রবীন্দ্রনাথের প্রথমদিকের গান ও পরিণত কালের গানে এই ক্ষেত্রে কোনও ভেদ ছিল না।
রবিবাবুর গান

রবীন্দ্রপরিবারে যে সাংস্কৃতিক আবহাওয়ার প্রচলন ছিল সেখানে ধারা ছিল দুটি। এক. রামমোহনী বা ব্র্রাহ্মধারা, দুই. পাশ্চাত্য ধারা। প্রথম ধারায় ছিল মহর্ষির অবদান ও দ্বিতীয় ধারা ছিল প্রিন্স দ্বারকানাথ থেকে ‘নতুন দাদা’ অর্থাৎ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অবদান। মধ্যে ছিল সমকালীন মধ্যপ্রাচ্যীয় তথা ইসলামী ও ঈরাণীয় এবং মোগলদরবারে গড়ে ওঠা মিশ্রধারার রেশ। রামমোহন বা মহর্ষির মধ্যে এই ধারার ভাবনাটি স্পষ্ট ছিল। তিনি বা তাঁরা এর সাথে ভারতীয় ঐতিহ্যের ফিউশন (ঋঁংরড়হ) ঘটিয়ে ‘ব্রাহ্মসঙ্গীত’ এর নিজস্ব ধারা (স্বরলিপিসহ) সৃষ্টির কথা ভেবেছিলেন। আদর্শ হিসাবে সিংহলের বৌদ্ধরীতিকে গ্রহণ করেছিলেন মহর্ষি। রবীন্দ্রনাথ রামমোহনের উপনিষদীয় ব্যাখ্যা ও গীতিধ্যান এবং পিতৃদেবের দর্শন ও মৌনীরূপ (‘কিশোর গায়ক [রবীন্দ্রনাথ] দেখতে পান পিতা হাতদুটি জোড় করে ধ্যানস্থ হয়ে গান শুনছেন। সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ গানের সঙ্গে ধ্যানকে মিলিয়ে ভাবতে শুরু করেন।’- করুণাময় গোস্বামী) অন্তরে গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজের সৃষ্টির মুক্তি (এখানে ‘গানের মুক্তি’) লক্ষ্য করেছিলেন বা খুঁজেছিলেন তার মধ্যে। তিনি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক হিসাবে প্রায় দশ বছর কাজ করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে তিনি তার আগে স্কটিশ ও বিলেতি যন্ত্র ও সুর বাদন (পিয়ানো প্রভৃতিতে) দুইই আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের নাট্যগীত ও অন্যান্য সৃষ্টিতে তার প্রয়োগের কথা আমাদের জানা। কিন্তু যা লক্ষ্য করার বিষয় তা হল, দ্বিজেন্দ্রলালের ইংলিশ টিউনিং থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত বরাবরই স্বতন্ত্র এবং প্রকৃতিতেও পৃথক। তাছাড়া দ্বিজেন্দ্রলাল যে সুরকে তাঁর চর্চার মধ্যে অব্যাহত রেখেছিলেন, সে সুরকে রবীন্দ্রনাথ ‘মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে বিচিত্রভাবে জড়িত’ বলে ভাবলেও ‘জীবনস্মৃতি’তেই তিনি স্বীকার করলেন, ‘এই আইরিশ মেলোডিজ…… বিলাতে গিয়া কতকগুলি শুনিলাম ও শিখিলাম কিন্তু আগাগোড়া সব গানগুলি সম্পূর্র্ণ করিবার ইচ্ছা আর রহিল না।’ পরে তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অমিল নিয়েও আলোচনা করেন। গভীর মনন ও সঙ্গীতিক রসচেতনা থেকে তিনি এই আলোচনা করেন যা ছিল তাঁর আন্তরিক অনুভূতি থেকে উৎসারিত। তখনই তাঁর মনে এ প্রশ্ন দেখা দিল যে, ‘এশিয়ার প্রায় সকল দেশেই আজ পাশ্চাত্য ভাবের সঙ্গে প্রাচ্যভাবের মিশ্রণ চলছে। এই মিশ্রণে নূতন সৃষ্টির সম্ভাবনা।….. আমাদের সাহিত্যে এটা ঘটেছে, সঙ্গীতেও কেন ঘটবে না বুঝি না।’

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টিতে আনলেন সেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তন।Ñ পরিবর্তন ঘটলো সরাসরি, ঘটলো নাটকের ভিতর দিয়ে, ঘটলো নৃত্যের কুরিওগ্রাফির মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ এর কার্যকরী ধারণাটা এবং প্রক্রিয়াটা ঠিক করলেন অন্যভাবে। নবীন সেন বললেন, ‘কবিতার মত এর গানের মেজাজটাও ভিন্ন।’ তিনি একটি ভবিষ্যতের সূর্যাঘাত দেখলেন, একটি নূতন সকালের আভাষ লক্ষ্য করলেন রবি (বাবু)- র গানে। উত্তরণের ঘাটে যে সোনার তরীটি ভেসে এলো, তারই নাম ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’।

রবীন্দ্রসঙ্গীত

সঙ্গীতের মিশ্র অবয়বে কথা ও রাগ (বা সুর) এবং উভয়ের অন্তর্গত ভাবের বিষয় ও আবেদন সৃষ্টির উপাদানগুলি একাকার হয়ে রবে আবার পৃথকভাবে চিহ্নায়ন যুক্ত হবে এই রকম একটা ধারণা সঙ্গীতকারদের মনে থেকে থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তার পরিচয় কোথাও স্ফুট ছিল না। রাজ্যেশ্বর মিত্রের একটি ব্যাখ্যা রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গে আমরা দেখি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সঙ্গীত কেবলমাত্র তিন তাল এক ফাঁকে গাওয়া ছোট খেয়াল বড় খেয়াল নয়, বা কতকগুলি লিরিকের নয়, তার বড় বড় চিন্তার দিক রয়েছে।’ রবীন্দ্রনাথ স্পষ্টই বলেছিলেন, অর্থহীন তারে-না-না প্রভৃতি যা-তা কথা ও তাকে মুচড়িয়ে সুর বের করার নামই সঙ্গীত নয়। তাতে ‘গলদঘর্ম’ হওয়াই সার হয়, সুর পরিপূর্ণ হয় না। কথার শ্রুতি-সুখ, শ্রুতি-মাধুর্য, ভাব-সুখ সৃষ্টিও তাতে প্রয়োজন হয়। হিন্দুস্থানী বা ওস্তাদি গানে কথা থাকে না, বা তা প্রধান নয়। রবীন্দ্রসঙ্গীতে এমন কি ‘রবীন্দ্র ধ্রুপদে’ও তা আবশ্যিক। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতবোধ ও সঙ্গীত জ্ঞানের পরিচয় মেলে এখানে।

তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতজ্ঞানের পরীক্ষা নেওয়া বাতুলতা মাত্র। রবীন্দ্রনাথ পারিবারিক যতেœ ও আবহে সঙ্গীত রসের সাথে ও তার বৈচিত্র্যের সাথে স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত হন। পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে সঙ্গীত বোদ্ধা এক প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রকাশ ঘটে বেথুন সোসাইটির আমন্ত্রণে। তিনি তখন ‘সঙ্গীত ও ভাব’ এই শিরোনামে মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে বক্তৃতা করেন। তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’র সাক্ষ্যে জানা যায় ‘সভাস্থলে এই আমার প্রথম প্রবন্ধ পড়া’ (প্রকাশ: ভারতী, জ্যৈষ্ঠ ১২৮৮)। সমকালীন ‘নাগরিক সঙ্গীত’ (তখনও ‘আধুনিক গান বা সঙ্গীত’ বলে কিছু সৃষ্টি হয় নি) এবং রাগ সঙ্গীত বা হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের ভেদও স্পষ্ট ছিল না, অন্তত পার্থক্যটা খুব বেশি ঘটে নি। রবীন্দ্রনাথের সেই সময় পাশ্চাত্য সঙ্গীত অনেকটাই জানা হয়ে গেছে। ফলে (উক্ত বক্তৃতা প্রবন্ধে) তিনি যে ওস্তাদী গানের ভঙ্গি-সর্বস্বতাকে (‘ভীষণ মুখশ্রী করিয়া গলদঘর্ম হইয়া গান’) মেনে নিতে পারেন নি, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল সঙ্গীত চিৎকারও নয়, জানপ্রাণ কসরৎসহ পুনরাবৃত্তিও নয়, তবে এটা মনোবাহিত রূপে পরিবেশন করতে হবে। সেইখানে তাঁর প্রস্তাব বা পরামর্শ ছিল ‘সঙ্গীত-বেত্তারা যদি বিশেষ মনোযোগ সহকারে আমাদের কী কী রাগিনীতে কী কী ভাব আছে তাহাই আবিষ্কার করিতে আরম্ভ করেন, তবেই সঙ্গীতের যথার্থ উপকার করেন।’ অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চান, কতগুলি ‘চেতনাহীন জড় সুরের’ সংযোগ সাধন না করে বরং ‘জীবন্ত অমরতার’ ধারাকে সঙ্গীতে ধারণ করা চাই। এজন্য কবিতাকে গান না হলেও চলে, কিন্তু গান কবিতাকে স্পর্শ করতেই পারে। তাই তিনি বলেছিলেন গানের কথা অর্থহীন (‘তারে-না-না-নারে’ প্রভৃতি) হলে গান অনেকখানি যেন প্রায় বোবাই হয়ে থাকে। গান এবং গানের তাল-লয়-সুরÑধুন-ধ্বনিতরঙ্গ সবইতো কথারই মাত্রাভেদ মাত্র। তাই রবীন্দ্র-সঙ্গীতে ‘কথা’র মূল্য এত। এখানেই রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীতকে ভাবের সংযোগে দুলিয়ে নিয়ে তৃতীয় মাত্রায় বা তৃতীয় সৃষ্টিতে গড়ে তোলেন।

রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে ইউরোপীয় (বিশেষত ‘বিলেতি’) সুর অনুকরণ-অনুসরণ করেছেন। হিন্দুস্থানী গানের ব্যকরণও অভঙ্গ অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সঙ্গীতের ‘ভাবতন্ত্র’ আবিষ্কারের সাথে সাথে ‘হারমনি’ ও ‘মেলডির’ তত্ত্বকে তিনি বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন নি, গ্রহণ করলেন ভারতীয় ঐতিহ্য ও দেশজ লোকজ সম্পদকে।Ñ গানে এলো মাটির পরশ, এলো নবত্ব, এলো প্রাণের শিহরণ। এলো আধুনিক সৃজনতা। রবীন্দ্রসঙ্গীতের যদি কোনও সংজ্ঞা হয় তবে তা এটাই। কালের সঙ্গতা ও চিরন্তনতা নিয়ে তার পরিচয়।

লেখক: ড. মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ; সাবেক ডীন, কলা অনুষদ; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।