Categories
প্রবন্ধ

শেকড়ের বাইরে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই: যতীন সরকার

যতীন সরকার বাঙালির মার্কসীয় তাত্ত্বিক। আত্ম-স্বার্থের বাইরে এসে গণমানুষের অধিকারের জন্য, শোষণমুক্তির জন্য যিনি রাজনীতি করেন। সব পরিচয়ের মধ্যে একটা পরিচয়কেই তিনি বড় হিসেবে বিবেচনা করেন- সেটা হচ্ছে তিনি শিক্ষক। শিক্ষকতাই তার কর্ম। এই শিক্ষকতার মাধ্যমেই তিনি মানুষের অন্তরে পৌঁছান। অন্তরে পৌঁছানোর পর তিনি তার কথা বলেন। তিনি যে মার্কসীয় দর্শনকে, সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করেন সেই কথাটা ছড়িয়ে দিতে চান। আদর্শবাদের বাইরে কোনো কথা বলা কিংবা লেখেন না। পূর্বজনদের মতো তিনিও মনে করেন, ‘সংস্কৃতিটা লক্ষ্য, রাজনীতি সেই লক্ষ্যে পেঁৗঁছাবার পথ’। যতীন সরকারের সেই রাজনৈতিক আদর্শবাদ নিয়ে, দর্শন নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সরোজ মোস্তফা।

অর্থনীতি প্রতিদিন: আজকের যতীন সরকারের স্কুলিংটা; মানে হয়ে ওঠার তপস্যাটা কখন এবং কীভাবে শুরু হয়েছিল?
যতীন সরকার: আমি জন্মেছিলাম অজপাড়াগাঁয়ের একটি গরিব পরিবারে। সেই সময়ের কেন্দুয়ার রামপুর এলাকাটি বাংলার প্রাচীনতম গ্রামের প্রতিচ্ছবি নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। সেই প্রাচীনতম প্রতিচ্ছবির ভেতরে একটা সমন্বিত সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ ছিল। সেই সমন্বিত সাংস্কৃতিক প্রতিবেশের আলোয় ১৯৩৬ সালে আমার জন্ম। হিন্দু-মুসলিম-গরিব-ধনী-জোতদার-জমিদারদের একটা সমন্বিত সমাজে বেড়ে উঠেছে আমার শৈশব। ধর্মকে, সমাজকে, সময়কে যুক্তির দৃষ্টিতে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টাটা আমি আমার পরিবার থেকেই শিখেছিলাম। আমার পরিবারটি ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে পুরো গ্রামের মধ্যে একটি এলিট পরিবার। আমার ঠাকুরদা রামদয়াল সরকার ছিলেন একজন গ্রামীণ এলিট। প্রকৃত অর্থেই আমার চিন্তা, চৈতন্য ও মানসজগতের ভিত্তিভূমি কিংবা শিক্ষালয় ছিল আমার পরিবার।
অ. প্র.: স্যার, আপনি বলেছেন পুরো গ্রামের মধ্যে আপনার পরিবারটি ছিল একটি বিখ্যাত এলিট পরিবার। ‘এলিট’ শব্দটিকে আমরা তো নানা অর্থে ব্যবহার করি। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বলুন।
যতীন সরকার: তুমি ঠিকই বলেছো। ‘এলিট’ শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহার হয়। আসলে এলিট মানে বিদ্বান। আমি এলিট বলতে বুঝিয়েছি পুরো গ্রামটার মধ্যে আমাদের বাড়ির মতো এমন বিদ্যার চর্চা কোথাও হতো না। সেই অর্থে আমি একটা এলিট পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করছি। এই বিদ্বান এলিট পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় আমার একটা সুবিধা হয়েছে। আমি হাল-চাষ শিখিনি। ক্ষেত-খামারেও কোনোদিন কাজ করিনি। কারণ কৃষকের সন্তান আমি ছিলাম না। আমার বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার। কিন্তু কৃষকের জমির আইলে দাঁড়িয়ে কৃষকের জীবনকে দেখার ও অনুভব করার একটা সংবেদনশীল এবং যৌক্তিক মন তৈরি হয়েছিল সেই রামপুরের প্রতিবেশে। কৃষককে যারা শোষণ করে সেই শোষক জোতদারকেও আবিষ্কার করার সূত্র আমি শিখেছি আমার পরিবারে। গ্রামীণ জোতদারদের দেখে দেখে তাদের ক্যাশবাক্স ভরার নীতিটাকে আমি ছোট বেলাতেই ঘৃণা করতাম। এই যে জীবনের দিকে তাকানো, জীবনকে উপলব্ধি করার বিদ্যা কিংবা জীবনকে ব্যাখ্যা করার শৃঙ্খলা-সূত্র আমি আমার পরিবার থেকেই শিখেছি।
অ. প্র.: স্যার, আপনি বলতে চাইছেন যে পরিবারটিতে আপনি বেড়ে উঠেছেন, সেই পরিবারটিতেই রোপিত হয়েছিল আপনার মননচর্চার ইতিহাস। অর্থাৎ এই পরিবারের অস্তিত্ব স্বীকার করেই আপনি যতীন সরকার।
যতীন সরকার: অবশ্যই। আমার শেকড়ের বাইরে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। শেকড়ের সংযুক্তিতেই আমার বিকাশ। আমার ঠাকুরদা, আমার ঠাকুর মায়ের চেতনাতেই রাঙায়িত হয়েছি আমি। আমার ঠাকুর মা বলতেন, ‘তোকে মাথায় রাখতাম না উকুনে খাবে, মাটিতে রাখতাম না পিঁপড়েয় খাবে। তোকে কোলেই রাখতাম।’ আসলে ছোটবেলায় খেলাধুলার সঙ্গে একেবারেই যুক্ত ছিলাম না। এটার কারণও আমার পারিবারিক অবস্থা। আমার ঠাকুরদার একটিমাত্র সন্তান আমার বাবা। আমার আর কোনো জ্যাঠা, কাকা, পিসি কেউ ছিল না। আমার বাবা বিয়ে করার পর একটি কন্যাসন্তান হয়। পাঁচ বছর বয়সে সেই কন্যাসন্তানটি মারা যায়। আমাদের বাড়িতে সবার মধ্যে একটি আশঙ্কা জন্মাল যে আমাদের বুঝি বংশ লোপ হয়ে যায়। তাই আমার ঠাকুর মা যেখানে যত দেব-দেবতা, পীর-ফকির-দরগা আছে; সেখানে যেতেন, মানত করতেন, শিরনি দিতেন। এই সব শিরনি কিংবা মানতকর্ম চলার একমাত্র কারণ ছিল বংশটা যেন কোনোভাবেই লোপ না হয়। তারপর আমি শুনেছি আমার যেদিন জন্ম হলো, ধাত্রীমুখে এই খবরটা শুনে ঠাকুরদা নাকি তাৎক্ষণিকভাবেই বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমাদের শান্তি হলো। আমি এর নাম রাখলাম শান্তি।’ আসলে অনেকটা নিষ্কর্মা করেই আমাকে বড় করা হলো। সব সময় পরিবারের লোকদের মধ্যে একটা আশঙ্কা ছিল, তাদের বংশ বুঝি লোপ হয়ে যায়। আমাকে গাছে চড়তে দেওয়া হতো না; খেলতে দেওয়া হতো না; এমনকি ভালো করে সাঁতারটা পর্যন্ত শিখতে দেওয়া হলো না; কিন্তু বই দিয়ে বসিয়ে রাখা হলো। আমিও বইয়ের জগতের মধ্যেই সমস্ত কিছুই পেয়ে গেলাম। বইয়ের চাইতে বড় কিছু নাই, এই বোধটা ছেলেবেলাতেই আমার হয়ে গেল। আসলে বইয়ের পাঠক ছাড়া আমি আর কিছুই হই নাই। এভাবেই কিন্তু আমি বড় হয়ে উঠেছি।
অ. প্র.: তাহলে কি আমরা বলতে পারি আপনার পুরো জীবনের নায়ক আপনার ঠাকুরদা রামদয়াল সরকার?
যতীন সরকার: তুমি ঠিকই বলেছো, আমার জীবনের নায়ক আমার ঠাকুরদা রামদয়াল সরকার। আমি ভাষা শিখেছি তার কাছে, রাজনীতি, দর্শন এবং ইতিহাসচর্চাটাও শিখেছি তার কাছে। দেখ তিনি ধর্মালোচনা করতেন, কিন্তু ধর্মের যে গোঁড়ামি সেটা থেকে অনেক দূরে ছিল ঠাকুরদার অন্তর। তার অনেক সমালোচনাই করা যাবে। অনেক স্ববিরোধিতাও তার ছিল। কিন্তু একটা জিনিস হচ্ছে ‘রেশনাল অ্যাপ্রোচ টু রেলিজিয়ন’ অর্থাৎ ধর্মকে যুক্তির দৃষ্টিতে দেখা; সেই ‘রেশনাল অ্যাপ্রোচ টু রেলিজিয়ন’-এর ব্যাপারটা আমার ঠাকুরদার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। ছোটবেলায় দেখা আমার ঠাকুরদার যৌক্তিক মনটা আমার মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। কিছু দৃষ্টান্তের কথা তোমাকে বলি, যেমন ধর প্রতিদিন ভোরে উঠে ¯œান করে আমাকে পাশে বসিয়ে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা শোনাতেন। শুধু শ্লোক কিংবা কাহিনীই শোনাতেন না; মহাভারতের যুদ্ধটা কেন হচ্ছে, গীতা কেন রচিত হয়েছে সেই কারণটাও ব্যাখ্যা করতেন। ওই যে বলছিলাম ‘রেশনাল অ্যাপ্রোচ টু রেলিজিয়ন’ সেটা করতেন। গীতা কেন, কীভাবে রচিত হয়েছে সেটা ঠাকুরদা ছোটবেলাতেই ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পঞ্চপাণ্ডবদের একজন অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, যুদ্ধটা আমি কেন করব, কার বিরুদ্ধে করব? এরা সবাই তো আমার আপনজন, আপনজনকে হত্যা করে আমি রাজা হতে চাই না। আমি ভিক্ষা করে খাব। যুদ্ধ আমি করব না। আমি আমার গা-িব ত্যাগ করলাম। অর্জুনের সারথি ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয় ভগবানের অবতার। তিনি রথ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তখন কৃষ্ণ বললেন, না অর্জুন, এইটা তুমি করতে পারো না। তুমি ক্ষত্রিয়। যুদ্ধই তোমার ধর্ম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোমাকে লড়তে হবে। এই বলে যুদ্ধপ্রান্তে তিনি যে উপদেশগুলো দিয়েছিলেন, সেই উপদেশগুলোই গীতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ধার্মিকেরা মনে করেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বাইরে যেখানে সঞ্জয় বসে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধের বিবরণ শোনাচ্ছেন, সেখানে বসেই সঞ্জয় দিব্যদৃষ্টি দিয়ে কৃষ্ণের শ্লোকগুলো মুখস্থ করে ফেলেছেন এবং রচিত করেছেন অষ্টাধ্যায়ী গীতা।
কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো চিন্তাবিদেরা এই ধারণার বিরুদ্ধে কলম ধরে ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র শ্রীমদভাগবদ গীতার ব্যাখ্যা করেছেন এবং বলেছেন ধর্মগ্রন্থ হিসেবে যারা শ্রীমদভাগবদ গীতাকে বিশ্বাস করেন, আমি তাদের জন্য ‘গীতার ভাষ্য’ লিখছি না। আমি শিক্ষিত লোকদের জন্য গীতার ভাষ্য লিখছি। অর্থাৎ সঞ্জয় বলেছেন আর অষ্টাধ্যায়ী গীতা মুখস্থ হয়ে গেছে ব্যাপারটা মোটেও এ রকম অলৌকিক কিছু নয়। বরং আবেগ তাড়িত অর্জুনকে যুদ্ধক্ষেত্রে রাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধনীতি এবং পৃথিবী সম্পর্কে বাস্তববাদী করে তুলতেই কৃষ্ণের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে গীতার কবিতা। বঙ্কিমচন্দ্রের এই ‘গীতার ভাষ্যে’র সঙ্গে ঠাকুরদা পরিচিত ছিলেন। পরিচিত ছিলেন বলেই গীতার লৌকিকতা সম্পর্কে আমাকে সচেতন করেছিলেন।
আমার ঠাকুরদা বলতেন, পৃথিবীর সমস্ত ধর্মই সত্য। পৃথিবীর সব ধর্মাবতার মানুষের কল্যাণে এসেছেন। যিশুখ্রিস্টের জীবনী, গৌতম বুদ্ধের জীবনী, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী তার কাছে শুনে শুনেই আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবান হয়েছি। কাজেই এভাবেই কিন্তু আমার চিন্তাচেতনা গড়ে উঠেছে। সেই চিন্তাচেতনা নিয়েই বড় হয়েছি।
অ. প্র.: দেশ ভাগ আপনার মনোজগতকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে বলে আপনি মনে করেন? অর্থাৎ আপনার রাজনৈতিক সচেতনতায় দেশভাগ কোনো প্রভাব রেখেছে কি না?
যতীন সরকার: দেশভাগ, দাঙ্গা, দ্বিখ-িত বাংলা- এসব ব্যাপার আমাকে নিশ্চয়ই আলোড়িত করেছে। তবে এই ব্যাপারটায় খুব দৃঢ় ভূমিকা রেখেছেন আমার বাবা। আমাদের আত্মীয়রা দেশত্যাগ করে চলে যাচ্ছে, প্রতিবেশীরা চলে যাচ্ছে, চারদিক থেকে চাপ আসছিল চলে যাওয়ার জন্য; কিন্তু বাবা যাননি। চারপাশের হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে গেল। আমার বাবা হোমিওপ্যাথ ডাক্তার। তার আয়-রোজগারও কমে এলো। কমে এলো মানে আমাদের না খাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হলো। তখন স্কুলে পড়ি। স্কুলে যেতে পারি না। রায়টের ভয়ে প্রতিনিয়ত আমরা তখন সংকুচিত ছিলাম। কিন্তু বাবার স্থিরতায় এবং আত্মবিশ্বাসে আমরা দেশত্যাগ করিনি। ছোটবেলার বিপন্ন মনটাই হয়তো দেশকে বুঝতে, দেশের মানুষকে বুঝতে, সমাজকে বুঝতে, রাজনীতিকে বোঝার একটা পাটাতন তৈরি করেছিল।
অ. প্র.: কমিউনিস্টদের সঙ্গে কিংবা কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে কখন, কীভাবে যুক্ত হলেন? সেই সময়ে আপনার রাজনৈতিক কিংবা আদর্শিক গুরু কারা?
যতীন সরকার: আনন্দমোহন কলেজে পড়ার সময় আমি কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে আসি। ময়মনসিংহে নয়া-জামানা পুঁথিঘর বলে একটা বইয়ের দোকান ছিল। সেই বইয়ের দোকানই ছিল আমাদের আড্ডাখানা। আসলে কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ ছিল। নয়া-জামানা পুঁথিঘর ছিল সেই নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির অফিসঘর। আলতাব আলী, লাল মিয়া, ওয়াহেদ আলী, অজয় রায়, রতু রায়, জ্যোতিষ বোস এই রকম কমরেডদের সংস্পর্শে এসে আস্তে আস্তে আমার চিন্তা নতুন রূপ ধারণ করল। সেই যে ‘ধর্ম’ নিয়ে আমি জীবন শুরু করেছিলাম, ‘রেশনাল অ্যাপ্রোচ টু রেলিজিয়ন’, সেই রেশনালিজমের রূপ থেকে আমি মেটেরিয়ালিজমে উত্তীর্ণ হলাম এই কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে এসে। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ‘হিস্টিক্যাল রোল অব ইসলাম’ বইটা পড়ে আমার চিন্তাভাবনা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। আনন্দমোহন কলেজের কেরানি মোহিনী মোহন দে আমাকে এই বইটা পড়তে দিয়েছিলেন। এই বইটা পড়ে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আমি শ্রদ্ধায় অবনত হলাম। কিন্তু অহি সম্পর্কে ওই বইতে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না। তাই বইটা পড়ার পর চিন্তাভাবনার দিক থেকে খুব এলোমেলো হয়ে গেলাম। ধর্ম সম্পর্কে ‘রেশনাল অ্যাপ্রোচ টু রেলিজিয়ন’ ব্যাপারটা আমার ছিল কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে মানবেন্দ্রনাথ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেটা মানা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব। এই মানতে না পারায় মাস তিনেক খুবই দোদুল্যমান ছিলাম। কী করব আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মানবেন্দ্রনাথের কথা বিশ্বাসও করতে পারছিলাম না, আবার অবিশ্বাসও করতে পারছিলাম না। এই অবস্থায় রতু রায় আমাকে বাঁচালেন। জেলখানা থেকে বের হয়ে রতু রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তার বাড়িও নেত্রকোনার রামেশ্বরপুর। তার বাসাটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির আশ্রয়স্থল। ১৯৫৭-১৯৫৯ এই সময়েই রতু রায় আমাকে পথ দেখালেন। ‘হিস্টরিক্যাল রোল অব ইসলাম’ নিয়ে আমার মধ্যে যে জট ঘুরপাক খাচ্ছিল তা দূর হয়ে গেল। স্ট্যালিনের ‘দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ বইটি পড়ে। তারপর অজয়দা, জ্যোতিষদা তারা মিলে আমাদের ছাত্রদের মধ্যে যারা প্রগতিশীল চিন্তাধারায় এসেছি, তাদের জন্য একটা পাঠচক্র তৈরি করলেন। আমি সেই পাঠচক্রে প্রথমে জ্যোতিষদা, পরে অজয়দার ছাত্র হয়ে কমিউনিস্ট দর্শন ডাইলেকটিক্সের সঙ্গে পরিচিত হলাম। পরিচিত হলাম অন্য কমরেডদের সঙ্গে। রাহুল সাংকৃতায়ন, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়সহ অন্য চিন্তাবিদদের বই পড়তে শুরু করলাম এবং আস্তে আস্তে আমার চিন্তাচেতনা ‘ডাইলিকটিকেল মেটেরিয়ালিজমে’ উত্তীর্ণ হলো। এক কথায় আমি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম।
অ. প্র.: যে বাঙালিকে আমরা ভাববাদী বলি, বাঙালির সেই ভাববাদের ভেতরেও আপনি সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সূত্র খুঁজে পান। কীভাবে পান? এ রকম একটি গবেষণা কর্মই বা করতে গেলেন কেন?
যতীন সরকার: ‘বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’ লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম না বলে বই লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের সমাজে, বুদ্ধিজীবী মহলে, এমনকি কমিউনিস্টরা পর্যন্ত মনে করত সোশ্যালিজমের ধারণাটি বহিরাগত। তখন প্রশ্ন উঠল, বিদেশি মতবাদ আমরা কেন গ্রহণ করব? বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের আমলে এই ধারণাটি বেশ প্রকট আকার ধারণ করল। আমি এই ধারণাটিকে মোটেও সত্য হিসেবে মানতে পারছিলাম না। কারণ ছোটবেলাতেই আমি প্রাচীন ভারতের সমাজ ও জীবন পদ্ধতি এবং ঋতের দর্শন ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। কাজেই তাদের বক্তব্য যে অসার এ সম্পর্কে আমার কোনো দ্বিধা ছিল না। কিন্তু তাদের উপযুক্ত জবাবও দিতে পারছিলাম না। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, সোশ্যালিজম কোনো একটা দেশের, কোনো একটা গোষ্ঠীর একক দর্শন হতে পারে না। সোশ্যালিজম সকল মানুষের, পৃথিবীর দর্শন। তখনই আমি প্রবীণ বিপ্লবী ও বুদ্ধিজীবী শ্রী চিন্মোহন সেহানবীশের ‘রুশ বিপ্লব ও প্রবাসী ভারতীয় বিল্পবী’ গ্রন্থটি পেলাম। আমার দৃষ্টি খুলে গেল। সেখানে তিনি উনিশ শতকীয় বাঙালি মনীষীদের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রতি পাঠকদের আকর্ষণ করেছিলেন। স্বল্প পরিসরে হলেও বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিশ্লেষণের বীজটা আমি শ্রী চিন্মোহন সেহানবীশের কাছ থেকে নিয়েছি। প্রকৃত অর্থে বইটায় আমি প্রাচীন ভারতীয় সমাজটাকে, ইতিহাসটাকে, ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গীয় রেঁনেসাসের মনীষীদের সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করেছি।
অ. প্র.: বাঙালির আধুনিকতার সূচনা পর্বকে কিংবা আধুনিক যুগের কয়েকজন সংস্কারবাদী মনীষা ও শিল্পীর কর্মকা-ের মধ্যে আপনি সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের উপাদান খুঁজে পেয়েছেন- বিষয়টি কতটুকু যুক্তিপূর্ণ।
যতীন সরকার: কমিউনিস্টরা কোনো অবদানকেই ছোট করে বিবেচনা করেন না। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণেই উন্মোচিত হয় মানুষ ও সমাজ। উনিশ শতকীয় বাঙালি মধ্যবিত্তদের কেউই মার্কস-এঙ্গেলস কথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রচার করেননি। কিন্তু এদেরকে ভাবোচ্ছ্বাসী, রোমান্টিক বলাও সমীচীন নয়। এরা সময়ের কাজটি করেছেন। ‘বাঙালির লৌকিক ঐতিহ্য’ থেকে শুরু করে উনিশ শতকের আধুনিক স্বপ্নবাজ মনীষীরা অবশ্যই বাংলায় সমাজতান্ত্রিক দর্শন প্রতিষ্ঠার কাজটা করেছেন। লেলিন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাক-মার্কসীয় ইউটোপীয়দের অবদানের কথা ভুলে যাননি। বরং প্রাক-মার্কসীদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর মধ্যেই রক্ষা হয় সমাজতন্ত্রের ইতিহাস। রাশিয়া তো সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছে। সেই রাশিয়াতেও ১৮৮০ দশকের আগে সমাজতন্ত্রের চর্চাটা শুরু হয়নি। প্লেখানব ১৮৮০ সালে একটি পাঠচক্র খোলেন। সেই পাঠচক্রেই মার্কস-এঙ্গেলসের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রচার শুরু। ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বেরিয়ে গেছে। কিন্তু সোশ্যালিজম, কমিউনিজম এই শব্দগুলো রাশিয়াতে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। তাহলে সেই সোশ্যালিজমটা কী? সেটা হচ্ছে প্রাক মার্কস-এঙ্গেলসের ইউটোপীয় সোশ্যালিজম। সেইটাই মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বেলিনস্কি, চেনিশেভস্কি, হের্ৎসেন, দব্রলিউবভ্- এরা রাশিয়ান চিন্তাবিদ। তাদের কথা লেলিন বারবার বলেছেন। কিন্তু এরা কেউ মার্কস-এঙ্গেলসের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু লেলিন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের কথা স্মরণ করেছেন। এমনকি যে তলস্তয় যিনি ১৯১০ সালে মারা গেছেন, সেই তলস্তয়কেও লেলিন ‘রুশ বিল্পবের দর্পণ’ বলছেন। কিন্তু খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের অনুসারী তলস্তয় বলশেভিক পার্টির বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তার লেখার মধ্যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বীজ ছিল।
তাহলে আমাদের দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রূপটা কেমন ছিল? মোটা দাগে বলা যায়, পৃথিবীর সব দেশেই মানুষে মানুষে একটা পার্থক্য আছে। এই যে মানুষে মানুষে পার্থক্য, এই পার্থক্য থেকে তৈরি হয় শ্রেণী। মানুষ চায় সেই শ্রেণীর অবসান ঘটুক। শোষণের অবসান ঘটুক। পৃথিবীব্যাপী মানুষের আকুতির এই ঐকতানটাই কমিউনিজমের মূল বক্তব্য। আসলে ইউরোপে সোশ্যালিজম শব্দটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশে ভাবনাটি চলে আসে। যিনি সোশ্যালিজম শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেন, সেই রবার্ট ওয়েন ছিলেন রামমোহনের বন্ধু। রবার্ট ওয়েনই সোশ্যালিজম শব্দটা প্রথম প্রচলন করেন। সোশ্যালিজম সম্পর্কে রবার্ট ওয়েনের সঙ্গে ডায়ালগও হয়েছে। বিবেকানন্দের কথা বিবেচনা করো। যিনি সারা পাশ্চাত্য দেশ পরিভ্রমণ করেছেন, সোশ্যালিজম সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছেন এবং নিজেকে যিনি আই এম এ সোশ্যালিস্ট হিসেবে দাবিও করেছেন- তাকেও কি আমরা মার্কস-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট বলতে পারবো। প্রকৃত অর্থে ১৯০০ সালের আগে আমাদের দেশে মার্কস-এঙ্গেলসের নামটাও কেউ উচ্চারণ করেননি। ১৯০০ সালে ‘ডন’ পত্রিকায় এঙ্গেলস আর ১৯০৩ সালের ‘অমৃতবাজার পত্রিকায়’ মার্কসের নাম পাওয়া যায়। ১৮৭০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইভা পরীক্ষায় প্রশ্ন হয়েছিল, ‘যিধঃ রং ঃযব ধরস ড়ভ পড়সসঁহরংস?’ অর্থাৎ বাঙালিদের ভেতরে প্রাক মার্কসীয় ইউটোপীয় কমিউনিজমের একটা চর্চা শুরু হয়েছিল। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে যার বিকাশ।
অ. প্র.: এই যে রামমোহন কিংবা বিবেকানন্দ কিংবা উনিশ শতকের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে যে সমাজতন্ত্রের সূত্রপথ বিবেচনা করছেন তা কতটুকু যুক্তিপূর্ণ?
যতীন সরকার: আমি অযৌক্তিকতো কিছু বলিনি। যৌক্তিকভাবেই একটা সময়কে, সমাজকে আর সেই সমাজের নায়কদের ডাইলেকটিকসের আলো ফেলে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেছি। রামমোহন কি পা মোচড়ানো একটা হিন্দু সোসাইটিকে সুস্থ করে তোলেননি? তিনি তো হিন্দু সমাজকে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে পৌঁছে দিয়েছেন। রামমোহনের এই সংস্কারবাদী কাজগুলোকে আমি বলছি সোশ্যালিজমের সিঁড়ি। ‘কলোনাইজেশনে’র বাইরে এসে সমাজকে যৌক্তিকভাবে মুক্ত করার এই চেষ্টাটাকেই আমি বাঙালি সমাজের সোশ্যালিজমের প্রথম ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছি। আর ইউটোপীয় সোশ্যালিজমের প্রবক্তা রবার্ট ওয়েনের সঙ্গে তার তো যোগাযোগ ছিলই। রবার্ট ওয়েনের মতের সঙ্গে রামমোহন সহমত হননি। কিন্তু ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গে চিন্তার যে আদান-প্রদান শুরু হয়েছিল তার মধ্য থেকেই জন্ম হয়েছে, ‘ব্রাহ্মসমাজ’ ‘কেশবচন্দ্র’ কিংবা ‘সমদর্শী গোষ্ঠী’র মতো সংগঠন এবং মানুষ। ১৮৭১ সালে কেশবচন্দ্র ‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকায় লেখেন- ‘পৃথিবীতে এমন একসময় আসিবে যখন ছোটলোকেরা আর চুপ করিয়া থাকিবে না, আর দুঃখে মাটির শয্যায় পড়িয়া থাকিবে না। এখনি বিলাতে তাহারা এমনি বলবান হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহারা আর রাজাকে মানে না। আপনাদের অধিকার, আপনাদের বিক্রম, আপনারাই প্রকাশ করিতে যায়।’ রামমোহনের উত্তরসূরি হিসেবে একটা ধারাবাহিক চিন্তা চর্চাকে অবলম্বন করেই কেশবচন্দ্রের এই উচ্চারণ।
অ. প্র.: নব্বইয়ে তো সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীর পতন হয়ে যায়। ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। পার্টিও ভেঙে যায়। অনেকেই মনে করতে থাকেন সমাজতান্ত্রিক দর্শনটাই ভুল ছিল।
যতীন সরকার: তুমি ঠিকই বলেছো, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রের দর্শনটাই ভুল ছিল এমনটা অনেককেই বলতে শুনেছি। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৭৭ জন মেম্বার ছিল। ১৪ জন বাদে সবাই পার্টি ত্যাগ করল। আক্ষেপ আর অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো এতদিন ধরে কী ভুলটাই না তারা করেছেন। আসলে পড়াশোনা না করেও, তত্ত্ব না জেনেও ভাসা ভাসাভাবে একটা মতবাদে বাস করা যায়। কিন্তু সময় যখন একটা বাঁকের মধ্যে এসে প্রবেশ করে তখনই পরীক্ষা হয়ে যায় ব্যক্তির গভীরতা। এই জন্যই মার্কস বলেছেন, ‘তত্ত্ব ছাড়া কর্ম এবং কর্ম ছাড়া তত্ত্ব- একটা ছাড়া আরেকটা অসহায়। একটা বন্ধ্যা, আরেকটা অন্ধ। কাজেই থিওরি জানতে হবে, থিওরি জেনে প্র্যাকটিস করতে হবে। প্র্যাকটিস ছাড়া থিওরির কোনো মূল্য নাই। দুইটা একত্রে সম্মিলিত না হলে যথার্থ কাজ কিছুই হয় না। আমি দেখলাম আমাদের কমিউনিস্ট পার্টিটা এই জন্যই ভেঙে গেল। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ আসলে থিওরি ও প্র্যাকটিসকে এক করতে পেরেছিল। কিন্তু আমি যখন থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, তখন থেকেই থিওরি ও প্র্যাকটিসের বিদ্যাটাকে সচল রেখেছি। রাহুল সাংস্কৃতায়ন, গোপাল হালদার, নরহরি কবিরাজ, ভবানী সেন- এরা ছিলেন আমার চিন্তার চার্জার। এই লেখকদের লেখা পড়ে একটা বোধে আমি উপনীত হয়েছি যে, ধর্ম চিন্তা থেকে শুরু করে সকল চিন্তার সঙ্গে যোগসূত্রতা স্থাপন করেই ডাইলেকটিকসের চর্চাটা করতে হবে। কোনো কিছুকে বাদ দিয়ে নয়, সকল কিছুকে গ্রহণ করে, পরিশোধন করে, ডাইলেকটিকস মূল সত্যটা বের করে আনে।
ঈদ আনন্দ সাক্ষাৎকার।