Categories
প্রবন্ধ

তরুণদের নিয়ে রণেশদা’র ভাবনা: কাজী মোহাম্মদ শীশ

বিংশ শতাব্দীর একজন অসাধারণ মানুষ রণেশ দাশগুপ্ত। আমাদের সকলের রণেশদা। সেই মানুষটির সাথে পরিচিত হওয়ার তাগিদে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। বহুমাত্রিকতার ধারক পূর্ণাঙ্গ মানুষটাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। হয়তো সে কারণে তার জীবনের নানা দিক নিয়ে পৃথক পৃথকভাবে নানা জনের নানাভাবে উপস্থাপনার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। তরুণদের নিয়ে রণেশদার ভাবনার দিকগুলো অবতারণা করার প্রচেষ্টা নিতে বলা হয়েছে আমাকে। রণেশদার রাজনৈতিক-দার্শনিক চিন্তা, সাহিত্য ভাবনা, সাংস্কৃতিক দিক অথবা সাংবাদিক জীবন কিংবা তরুণদের নিয়ে ভাবনা এমনকি জীবন যাপনের ধারা একের সঙ্গে অন্যটি মিলেমিশে আছে। আর তাই সমগ্র মানুষটাকে উপলব্ধি করার জন্য এক অঙ্গের আলোচনায় অন্য অঙ্গের আবির্ভাব অনিবার্য।
রণেশদাকে পাঠ করে, তাঁর আদর্শকে ধারণ করে তাঁকে নিয়ে তাঁর সম্পর্কে নিজের ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করা হয়তো অপেক্ষাকৃত কম কষ্টসাধ্যÑঅন্যদিকে আমরা যারা তাকে পড়েছি কম, চর্চা করেছি আরও সামান্য অথচ তাঁর সাথে পরিচয় ছিল দীর্ঘদিনের, সঙ্গ পেয়েছি অনেক-তাদের পক্ষে রণেশদার ভাবনাগুলোকে, জীবন-দর্শনকে তুলে ধরা তত সহজ নয়। তবু নিজের অকিঞ্চনতা দিয়ে রণেশদার অসীমতাকে একটু ছোঁয়ার প্রয়াস নিলে ক্ষতি কি? ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রণেশদার কিছু লেখা তো সামনে রয়েছে। তাঁর লেখার অংশ বিশেষই তো আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তরুণদের নিয়ে রণেশদার ভাবনাগুলিকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য রণেশদার শৈশব-কৈশোর-তরুণ-পূর্ণ বয়স এবং শেষ জীবনের সাথে কিছুটা হলেও পরিচিত হতে হবে। তার জীবনের সে সব দিক নিয়ে কিছু কথা প্রসঙ্গক্রমে আসবে।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো নিজেকে গড়ে তোলার জন্য স্বদেশ ও বিদেশের বোধ- এমন কোনো মনিষী নেই যাঁকে তিনি স্পর্শ করতে প্রয়াস নেননি। তাদের মধ্যে রণেশদার জন্মের কয়েক শ’ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে, তার সমসাময়িক ও তাঁর পরিণত সময়ের তরুণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। রণেশদা বহুযতেœ লালিত তাঁর সারা জীবনের দর্শন সকল বয়সী মানবপ্রেমিকদের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন। এই খুঁজে পাওয়ার সন্ধান পাওয়া যায় কয়েকজন অসাধারণ মানুষের ওপর রণেশদার লেখা থেকে। আর সেগুলোই হতে পারে তরুণদের মনন ও মানস গঠনে প্রেরণার অন্যতম উৎস। রণেশদার চিন্তা-চেতনায় এঁদের প্রভাব লেখার শিরোনাম থেকে উপলব্ধি করা যায়:
ক্স লালন : শাশ্বত ও বৈপ্লবিক (জন্ম : ১৭৭২ মতভেদে ১৭৭৪- মৃত্যু ১৮৯০)
ক্স বিদ্যাসাগর : আধুনিক বিদ্রোহী রূপরঙ্গী (১৮২০-১৮৯১)
ক্স নজরুল কাব্য : প্রবাহের জঙ্গম বিচার (১৮৯৯-১৯৭৬)
ক্স মার্কসবাদীদের চোখে জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)
ক্স বিজন ভট্টাচার্য : বরেণ্য বিপ্লবী লোকায়ত নট ও নাট্যকার (১৯১৫-১৯৭৮)
ক্স সুকান্ত : নিকষিত হেম (১৯২৬-১৯৪৭)
ক্স মুনীর চৌধুরীর রাজনৈতিক বিপ্লবী সত্তা (১৯২৫-১৯৭১)
ক্স শহীদুল্লা কায়সার : কত বিদ্রোহ অগ্নিশিখা (১৯২৭-১৯৭১)
ক্স দস্তয়েভস্কি : দিন বদলের পালায় (১৮২১-১৮৮১)
ক্স গিওর্গি লুকাচ : মার্কসীয় সৌন্দর্যতত্ত্বের অফুরন্ত খনি (১৮৮৫-১৯৭১)
আর এ সমস্ত লেখাতে রণেশদা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সামনে এনেছেন বারবার। বিশ্বকবির ‘লোকায়ত ভাবনাচিন্তা, রূপ-সৃষ্টি ও মানবিক মুক্তিধারা’য় তিনি বিশেষভাবে প্রবাহিত হয়েছেন। এ লেখাগুলোতে রণেশদা একদিকে তাঁর জীবন দর্শন ও মননের উৎকর্ষতার সহায়ক হিসেবে এঁদের পেয়েছেন অন্যদিকে সর্বকালের জন্য তরুণ সমাজের মানসে এসব মনিষীর উপস্থিতি কেন অনিবার্য তা তুলে ধরেছেন। আমরা দেখি লালন সাঁইয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন,
বাউল ও লোকসঙ্গীতের তরঙ্গ থেকে লালন সাঁই এবং অন্যান্য লোকসাধকেরা কায়েমী স্বার্থ ও রক্ষণশীলদের প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার দরুন তাঁদের চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তা ইতিপূর্বে কৃষক ও অন্যান্য নিপীড়িতজনের নিদ্রোহ কিংবা গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানে বিপবী ভূমিকা নিয়েছে। সম্প্রতি বিশেষ দু’টো কারণে এই বিপ্লবী ভূমিকা বাউল ও লোকসঙ্গীতের শাশ্বত আত্মিক আবেদনকে সমাজ বদলের পালায় যুক্ত করেছে। এই দুটো কারণ হলো : (১) আমাদের উপমহাদেশ জুড়ে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও সংঘর্ষের নিরসনের জন্য আজ চাই জনগণমনে মানবিকতাবোধ ও বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা; (২) দুই বাংলার রাজনৈতিক কাঠামোকে অক্ষুন্ন রেখে মৈত্রীর সেতুকে নবায়িত করা।
প্রতিক্রিয়াশীল ও কায়েমী স্বার্থবাদীরা কেন লালন সাঁইয়ের ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে অথবা বাউলদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে স্বল্প কথায় (উপরের উদ্ধৃতিতে) রণেশদা তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এসব প্রগতিবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ওপর লিখতে গিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিদ্যাসাগরের ওপর লেখাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন,
রবীন্দ্রনাথ সমাজিক ও ব্যক্তিক দিক দিয়ে বিদ্যাসাগরের বিদ্রোহী ও মনুষ্যত্ববাদী, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতা, হৃদয়বত্তা ও বুদ্ধিমত্তাকে বড় করে সামনে রাখলেন। রবীন্দ্রনাথের লেখাটির প্রধান সুর হলো, বিদ্যাসাগরকে তদানীন্তন কলকাতা বা বাঙ্গালী সমাজে একটা বিরূপতা ও বিপক্ষতার ঘের থেকে বের করে এনে বাংলার নব-জাগৃতির প্রবল প্রাণবান অপরাজেয় প্রতিভূরূপে দেখানো।
একই প্রবন্ধে রণেশ দাশগুপ্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আজকের দিনের তরুণ সমাজের কাছে এভাবে তুলে ধরছেন,
আজ আমরা উনিশ শতকের বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগৃতি বা বুদ্ধির মুক্তির সমগ্র ঘটনাটাকেই শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের কাণ্ডকারখানা বলে সচরাচর চিহ্নিত করি। কোন কোন সময়ে আমরা বিশেষ করে বর্তমান বিশ শতকের বিশের দশক থেকে অবিশ্রান্তভাবে চলে আসা অভ্যুত্থানের কতকগুলি দাবী, কর্মসূচী ও তাগিদকে উনিশ শতকের জাগৃতিতে একেবারেই অথবা পুরোপুরি না পেয়ে ক্ষুদ্ধ হয়ে পুরো জাগৃতিটাকেই জনসম্পর্কহীন বলে ধরে বসি। আমরা বিশেষ করে গত এক শতাব্দীর বিশ্বজোড়া সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক উত্থানের সারবত্তা দিয়ে পরিমাপ করে বিদ্যাসাগর ও মাইকেলকেও কিছুটা সেকেলে বলেই ধার্য করে বসি। এটা একটা রেওয়াজও হয়ে ওঠে। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর (১৯৭০) অথবা মৃত্যু- শতবার্ষিকীর (১৯৯১) নব পর্যায়িক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর, মাইকেল এবং অন্যান্য সবার সৃষ্টি ও কর্মকাণ্ডের ধারাকে আজকের লোকজীবনের প্রেক্ষাপটে রাখতে গিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাঁরা আজকের আধুনিক বিজ্ঞানী পর্যায়েরও অন্তর্ভুক্ত।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি, অত্যাচার-উৎপীড়ন প্রতিরোধে সোচ্চারিত কণ্ঠের পুরোধা হিসেবে তরুণ সমাজের কাছে সমাধিক সমাদৃত। রণেশ দাশগুপ্তও কবির এ ধারাকে অনেক বড়ভাবে দেখেছেন। কিন্তু সেই সাথে কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ভাণ্ডারের মূল প্রবাহকে তরুণ সামজের কাছে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন, প্রশ্ন রেখেছেন,
বাংলা কাব্যকেও কি আমরা সাগরমুখী বলে বর্ণনা করিনি? বাংলা কাব্যের মধ্যে নজরুল কাব্য-প্রবাহও কি এই বর্ণনার আওতার মধ্যে পড়ে না ? কিন্তু আমরা কি এদের একই দৃষ্টিতে দেখি? এদের কি আমরা আমাদের নদী-প্রবাহের স্বভাববিশিষ্ট বলে চিহ্নিত করি? আমরা কি নতুন নতুন খাত থেকে নজরুল-কাব্যের অমিয়ধারাকে আঁজলা করে তুলে নেই? কিংবা মরা গাঙ ছেড়ে গহীন গাঙের খোঁজ করি? ছড়িয়ে দিতে চাই মূল প্রবাহকে নহরে নহরে, বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত লোকে-লোকালয়ে ? এ-প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রবৃত্ত হয়ে আমরা দেখব, নজরুল-কাব্যের প্রকৃতির মুখোমুখি হবার ব্যাপারে আমাদের বেশ কিছু দেরী হয়ে গিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলা কবিতার প্রকৃতিকেই আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘ছবি’ কবিতার প্রশ্নের ছাঁচে পটে আঁকা স্থির আলেখ্য হিসাবেই দেখতে অভ্যস্থ। নজরুল-কাব্যকেও আমরা বহমান, বেগমান, বিকাশমান এবং এক কথায় আমাদের পরিবর্তমান জীবনের শিরায় শিরায় জীবন্ত প্রবাহরূপে আমাদের জীবন যাপনে সময়মত পুরোপুরি গ্রহণ করিনি। সুতরাং মননেও সেই পরিস্থিতির ব্যতিক্রম ঘটবে কি করে?
অন্যদিকে যেমনটা অনেকে ধারণা করেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা কেবল নির্জনতাকে কাছে ডেকেছে অথবা নৈরাশ্যবাদকে লালন করে আছে, রণেশদা তাঁকে সেভাবে চিত্রিত করেননি। প্রথমত: প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জীবনানন্দ দাশকে এভাবে দেখেছেন,
তিনি (জীবনানন্দ দাশ) সারা উপমহাদেশের তো বটেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম সর্ম্পকে খুব গভীরভাবে এবং বড় মাপেই খবর রাখতেন। …… ১৯৩০-এর দশকে ছাত্রজীবনে যখন তার সাথে আমার দেখা হয় এবং আমি যখন গুটিকয়েক মার্কসীয় গ্রন্থ পড়ে সোচ্চার হতাম, তিনি মাঝে মাঝে স্মিত হেসে দু’চারটা প্রশ্নে আমাকে বেকায়দায় ফেলতেন।
আবার বৈপ্লবিক বিশ্লেষণ থেকেও জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যে আশাবাদকে খুঁজে পেয়েছেন রণেশদা। জীবনানন্দ দাশের কবিতার স্বদেশ ও বিশ্বপ্রকৃতির নানা মানবিক সমাজিক উত্তরণের দিকগুলোকে তরুণ সমাজের কাছে তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন জীবনানন্দ দাশের সুস্পষ্ট প্রতিশ্র“তি
যতদিন পৃথিবীতে জীবন রয়েছে
দুই চোখ মেলে রেখে স্থির
মৃত্যু আর ব্যঞ্জনার কুয়াশার পারে
সত্য সেবা শান্তি যুক্তির
নির্দেশের পথ ধরে চলে
হয়তো-বা ক্রমে আরো আলো
পাওয়া যাবে বাহিরে-হৃদয়ে,
মানব ক্ষয়িত হয় না জাতির ব্যক্তির ক্ষয়ে।
ইতিহাসে ঢের দিন প্রমাণ করেছে।
(যতদিন পৃথিবীতে)
অথবা
মানুষের সভ্যতার মর্মে ক্লান্তি আসে;
বড় বড় নগরীর বুকভরা ব্যথা;
ক্রমেই হারিয়ে ফেলে তারা সব সংকল্প স্বপ্নের
উদ্যমের অমূল্য স্পষ্টতা।
তবুও নদীর মানে স্নিগ্ধ শুশ্র“ষার জল, সূর্য মানে আলো;
এখনো নারীর মানে তুমি, কত রধিকা ফুরালো।
(মিতভাষণ)
জীবনানন্দ দাশের লেখায় এমন উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে অঢেল। মার্কসবাদীর চোখে জীবনানন্দ দাশের লেখাকে রণেশ দাশগুপ্ত যেভাবে ইতিবাচকরূপ দিয়েছেন- তেমনটা তার সমসাময়িক চিন্তাবিদদের মধ্যে বড় বেশি দেখা যায় না।
এই পর্যায়ে তাঁর কালের তরুণ কবি-সাহিত্যিক-লেখক-সমাজকর্মীদের নিয়ে রণেশদার ভাবনার দিকগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। আর তা করতে হলে রণেশ দাশগুপ্তের তরুণ-যুবক বয়সের কর্মযজ্ঞের সাথে পরিচিতি হওয়া দরকার। এই কর্মপরিধি যেমন বহুবিধ তেমনি বিপুল। তারই একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ঢাকায় প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ। আমরা দেখবো এই সংঘের মাধ্যমে সমাজ-চেতনা, নৈতিক শক্তির বিকাশ ও সংবেদনশীল মনকে তরুণদের মধ্যে সঞ্চারিত করার মহান উদ্যোগ নিয়েছিলেন রণেশদা। তবে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’র কার্যধারা ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’-এর সাথে এটি একই সূত্রে গাঁথা ছিল। আবার সর্বভারতীয় সংগঠনটি সৃষ্টির মূলে ছিল একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক পটভূমি। খুবই সংক্ষেপে পটভূমিএরূপ :
১৯৩৫ সাল। তখনও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয় নাই। তবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ৩টি দেশ। হিটলার জার্মানিতে শুরু করে দিয়েছে নির্বিচারে হত্যা-বই পোড়ানো ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপ। ফ্যাসিস্ট মুসোলিনী ইতালিতে প্রগতিকামী গণতান্ত্রিক শক্তিকে স্তব্ধ করে আবিসিনিয়া আক্রমণ করতে উদ্যোগী হয়েছে। জাপানের সমর নায়করা নিচ্ছে ভয়াবহ আক্রমাণাত্মক যুদ্ধ প্রস্তুতি। মানবজাতিকে ফ্যাসিস্টদের এই ঘৃণ্য থাবা থেকে রক্ষা করার জন্য ফরাসী সাহিত্যিক রম্যাঁ রোলা ও আঁরি বারবুস এবং রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি বিশ্বের মানবতাবাদী শিল্পী-সাহিত্যিকগণের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাদের ডাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অগ্রগণ্য প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিকরা মিলিত হন প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক মহাসম্মেলনে ১৯৩৫ সালের ২১ জুন তারিখে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের নানা দেশের লেখক-শিল্পীদের সচেতন করা এবং ফ্যাসিস্ট বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে সক্রিয় অংশ গ্রহণের জন্য এই সম্মেলনে গঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব রাইটার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব কালচার এগেনস্ট ফ্যাসিজম।’ দেশে দেশে অতি দ্রুত এই সংগঠনের শাখা অথবা সহযোগী সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। একই বছর নভেম্বর মাসে বৃটেন ও ভারতের লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা লন্ডনের একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় সমাবেশ করেন। সমাবেশে ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৯৩৫ সালের ডিসেম্বরে সংঘের ইশতেহার প্রকাশিত হয়। পরের বছর ১৯৩৬ সালের এপ্রিল মাসে লক্ষেèৗয়ে মুনশী প্রেমচন্দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’ গঠিত হয়। সংঘের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন মুনশী প্রেমচন্দ। সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহীর। খুব স্বল্প সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রগতি লেখক সংঘের শাখা গঠিত হয়। ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে একটি শোকসভা অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার এ্যালবার্ট হলে ১৯৩৬ সালের ২৫ জুন। সেদিনই ড. নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে সভাপতি এবং অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ।’
এ সময় ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে স্পেন প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে জেনারেল ফ্রাঙ্কো বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পৃথিবীর মানুষ আর এক ফ্যাসিস্ট আক্রমণের নগ্নরূপ দেখতে পায়। স্পেনে গড়ে ওঠে ফ্যাসিস্ট বিরোধী ‘পপুলার ফ্রন্ট’। বিশ্বের সকল মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক শক্তি, প্রগতিশীল সাহিত্যিক-শিল্পী ফ্যাসিস্ট-বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং ‘আন্ত র্জাতিক ব্রিগেড’ গঠনের মাধ্যমে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই সংগ্রামে ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে অনেকে প্রাণ হারান । র‌্যালফ ফকস, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, জন কর্নফোর্ড, ফেদারিকো গারথিয়া লোরকা প্রমুখ সাহিত্যিকগণ ফ্যাসিস্ট আক্রমণে শহীদ হন।
এমনই এক পটভূমিতে ঢাকাতেও প্রগতি লেখক সংঘের শাখা খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রণেশ দাশগুপ্ত ছিলেন এই উদ্যোগের প্রাণ পুরুষ। প্রাথমিক পর্যায় ১৯৩৭ সালের শেষদিকে রণেশদা”র আহক্ষানে নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহীর, নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী এবং সংঘের অন্যতম সংগঠক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ঢাকায় আসেন। এই প্রস্তুতি পর্বে রণেশদা’র সাথিদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন তরুণ কবি ও লেখক। প্রস্তুতি পর্বের কথা জানাতে গিয়ে রণেশদা লিখেছেন,
ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা হয়েছিল একটা সন্ধিক্ষণে। শাখা স্থাপনের প্রস্তুতির মূলে ছিলেন কয়েকজন তরুণ লেখক, যাঁরা ভাবছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও গণমুখী ঘোষণাপত্র অনুযায়ী অবিলম্বে কিছু করা দরকার। যাঁরা এই প্রয়োজন অনুভব করছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ-বয়সী ছিলেন সোমেন চন্দ, যাঁর বয়স তখন আঠারো; আর সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন সতীশ পাকড়াশী ( অগ্নিযুগের কথা-র লেখক), বাংলার অগ্নিযুগের পথিকৃৎদের একজন, যাঁর বয়স সে-সময়ে পঁয়তাল্লিশ অতিক্রম করেছে। সোমেনের দুই সমবয়সী বন্ধু একেবারে গোড়ার দিকে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন। একজন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত- সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অতি-আধুনকি কবিতা লিখে নাম করেছিলেন, তাঁর কবিতার বই স্বপ্ন-কামনা তখন প্রকাশনার পথে- ভূমিকা লিখে দিয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। অপরজন অমৃতকুমার দত্ত।
উল্লেখ্য যে এ সময়ে রণেশ দাশগুপ্ত’র বয়স ছিল ২৭ বছর। তিনি এঁদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে গড়ে তোলেন ঢাকার এই সংঘকে।
প্রস্তুতি পর্ব সমাপ্তির পর ১৯৩৯ সালে সংঘের একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। এভাবে সংঘের পথযাত্রা শুরু হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ উদ্বোধন করা হয় ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে- ঢাকার গেণ্ডারিয়া হাই স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনের মাধ্যমে। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ‘বুদ্ধিরমুক্তি’ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা কাজী আবদুল ওদুদ। সম্মেলনে রণেশ দাশগুপ্তকে সম্পাদক ও সোমেন চন্দকে সহ-সম্পাদকের দায়িত্বভার প্রদান করা হয়।
প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলন হয় ১৯৪১ সালে ঢাকার সদরঘাটের কাছে ব্যাপিস্ট মিশন হলে। কাজী আবদুল ওদুদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। সম্মেলনে সোমেন চন্দ সম্পাদক ও অচ্যুত গোস্বামীকে সহ-সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সংগঠনটি বাংলার এই অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। ১৯৩৯ সালে যাত্রা শুরু করে ১১ বছর পর সংগঠনটি বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত রণেশ দাশগুপ্ত প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের মূলচালিকা শক্তি ছিলেন। ১১ বছর প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ একদিকে যেমন সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক আন্দোলন করেছে অন্যদিকে সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে সকল প্রকার প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই সংঘ এবং সমধর্মী অন্যান্য সংগঠনের মিলিত কর্মকাণ্ডের কিছু বিবরণ দেওয়ার আগে প্রবীণ বুদ্ধিজীবী-সাহিত্যিক জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের মূল শক্তি হিসেবে রণেশদা’কে কিভাবে দেখেছেন প্রাসঙ্গিকক্রমে তা উল্লেখ করা য়ায় :
এই সময়ে ঢাকার প্রগতি লেখক সংঘের অনেকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ আলাপ-পরিচয় গড়ে ওঠে। (চল্লিশ দশকের গোড়ার দিকের কথা। কবীর চৌধুরী তখন সবে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে ঢুকেছেন-লেখক) ওদের মধ্যে রণেশ দাশগুপ্ত ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। প্রখর বুদ্ধির অধিকারী, প্রবল ব্যক্তিত্বশালী, রুচিশীল, আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে অনমনীয়, অথচ একটুও একগুঁয়ে বা অসহিষ্ণু নন। রণেশদা সর্বদা চাইতেন এদেশের বুদ্ধিদীপ্ত তরুণরা সাম্যবাদী আদর্শকে বরণ করুক কিন্তু এজন্য তিনি কখনো স্থুল প্রচারধর্মিতাকে প্রশ্রয় দেননি। রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পার হিটলারের নাৎসী বাহিনী যখন সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করে বসে তখন এ-উপমহাদেশের বামপন্থী আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়। সে-সময়ে এখানে ফ্যাসিবিরোধী সাহিত্যগোষ্ঠী ও সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে রণেশদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওই সময় আমার চাইতে আমার অনুজ মুনীর চৌধুরীর সঙ্গেই তাঁর ঘনিষ্ঠতা গাঢ়তর ছিল। পরবর্তীকালে মুনীর যখন ঢাকার জেলে কারাবন্দির জীবন যাপন করছে তখন রণেশদা তাকে ‘কবর’ নাটক রচনায় উদ্ধুদ্ধ করেন।
প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার সমসময়ে ঢাকা শহরের দক্ষিণ মৈশুণ্ডির জোড়পুর লেনে কমিউনিস্ট পার্টির অফিস থেকে শ্রমিক শ্রেণী ও যুব সমাজকে সামজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও মার্কসবাদ দর্শনে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য ‘কমিউনিস্ট পাঠচক্র’ নামে একটি গোপন সংগঠন পরিচালনা করা হত। তবে কমিউনিস্ট পাঠচক্রের একটি প্রকাশ্য শাখা ছিল ‘প্রগতি পাঠাগার।’ উভয় সংগঠনের সঙ্গে রণেশদা শুধু ওতপ্রোতভাবে জড়িতই ছিলেন না বলা যায় মূল দায়িত্বই তিনি পালন করেছেন। এই একই সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিংস্রতা ছড়িতে পড়ে। ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করার জন্য দেশে দেশে জনমত পড়ে ওঠে। ১৯৪১ সালের জুন মাসে কলকাতায় ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’ গঠিত হয়। ঢাকায় ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি গঠিত হয়’ ৪২ সালের জানুয়ারি মাসে। সোমেন চন্দ এই সমিতি গঠনে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখেন।’ ‘প্রগতি পাঠাগার’, ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’ এবং ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ সম্মিলিতভাবে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
প্রগতি পাঠশালা অধিকারবঞ্চিত নিরক্ষর মানুষদের সাক্ষরতা প্রদানের কাজটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিত। এই পাঠশালায় নিম্নবর্গের নিরক্ষর ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা দেয়া হত। লেখক সংঘের কর্মীরা অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে এখানে কাজ করতেন। পাঠশালা পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন সোমেন চন্দ। তিনি আকস্মিকভাবে নিহত হওয়ায় রণেশ দাশগুপ্তের ওপর অর্পিত হয় সে দায়িত্ব।
প্রগতি সংঘ নবীন-প্রবীন লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলে ঢাকার রমনা, পুরানা পল্টন প্রভৃতি এলাকায় সাহিত্যবাসর ও সাহিত্য-বিষয়ক আলোচনা-সমাবেশ পরিচালনা করে।তখনকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এ সকল কর্মকাণ্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে কোন প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে প্রগতি লেখক সংঘের সদস্যগণ বিশেষ করে তুরুণেরা রণেশদার নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই সংঘ চল্লিশের দশকের শুরুতে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এ সময় সোমেন চন্দ লেখেন তার অসামান্য গল্প ‘দাঙ্গা’। পরবর্তী সময়ে সোমেন চন্দ ঢাকার সূত্রাপুরে আয়োজিত ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে একটি মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্মীবাজারে কাছে উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের আক্রমণে নিহত হন। এই বিষাদঘন দিনটি ছিল বরিবার ৮ মার্চ, ১৯৪২ সাল। এভাবে প্রভূত সম্ভাবনাময় বিস্ময়কর প্রতিভাবান এক তরুণের জীবাবসান ঘটে মাত্র ২২ বছর (২১ বছর ৭ মাস ১৫ দিন) বয়সে। রণেশদাও দাঙ্গা বিরোধী ও মানবতাবাদী কাজ করতে গিয়ে আহত হন। ১৯৪৩-এর জুলাই মাসে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ঢাকার মাহুতটুলিতে দাঙ্গাবাজদের আক্রমণে রণেশদা আহত হন।
ইংরাজি ১৯৪৩ বাংলা ১৩৫০ সনে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনও শেষ হয় নাই। পঞ্চাশের সেই মন্বন্তরে খাদ্যাভাব ও অসুখ-বিসুখে বহু লোক মারা যান। প্রগতি লেখক সংঘের কর্মীবাহিনী নিয়ে রণেশ দাশগুপ্ত বেরিয়ে পড়েন দুঃস্থ মানুষের সেবায়। নিজেদের অর্থ দিয়ে, চাঁদা ও অনুদান নিয়ে তারা ঢাকা শহরে দু’টি স্থানে লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। সংঘের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এই লঙ্গরখানা পরিচালনা করেন।
প্রগতি লেখক সংঘ প্রবীন-নবীন লেখদের নিয়ে দু’টি জীবনভাবনাপুষ্ট প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। প্রত্রিকা দু’টি হল ‘ক্রান্তি ’ এবং ‘প্রতিরোধ’। ১৯৪০ সালে রণেশ দাশগুপ্তের সম্পাদনায় ক্রান্তির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের প্রক্ষে সোমেন চন্দ। সোমেন চন্দের ‘বনস্পতি’ গল্পটি এ সংখ্যায় ছাপা হয়।
প্রগতি লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল প্রতিরোধ পাবলিশার্স। সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর এই পারলিশার্স থেকে ‘প্রতিরোধে’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে। কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত এবং অচ্যুত গোস্বামী ছিলেন এর প্রথম সম্পাদক। পরবর্তী সময়ে রণেশ দাশগুপ্ত ও অজিতকুমার গুহ পত্রিকাটি’র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা-কলকাতাসহ বাংলার নানা অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত এবং সম্ভাবনাময় তরুণদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছিল পত্রিকা দু’টি। কিশোর বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আগামী’ কাবিতাটি প্রকাশিত হয় ‘প্রতিরোধে।’ এ সম্পর্কে রণেশদা একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন :
চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের মুখপত্র ছিল ‘প্রতিরোধ’। আমরা যারা এই ছিমছাম গণমুখী সংগ্রামী সাহিত্য পত্রিকাটি চালাতাম, তারা সাধারণত নিজেরাই এর আদ্যোপান্ত লিখতাম। একদিন ডাকের চিঠি এলে একটা বড় চৌকো খাম খুলে পাওয়া গেল একটি কবিতা। গোটা গোটা অক্ষরে খুব যতœ করে সাজিয়ে লেখা। কবির নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবিতার নাম ‘আগামী’।
প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের বহুবিধ কর্মকাণ্ডের আর একটি হল পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা। এই আন্দোলনে রণেশ দাশগুপ্তের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে গঠিত ‘রাষ্ট্রভাষা-সংগ্রাম পরিষদ’-এর কয়েকটি সভায় প্রগতি লেখক সংঘের পক্ষ থেকে রণেশদা প্রতিনিধিত্ব করেন। তারই অনুরোধে (তিনি তখন রাজবন্দি) তরুণ লেখক মুনীর চৌধুরী কারাবন্দি অবস্থায় ভাষা আন্দোলনের পটভূমির ওপর ‘কবর’ নাটক রচনা করেন- যে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে লেখক ও সংগ্রামী তরুণ সোমেন চন্দ, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী পরবর্তী সময়ে মুনীর চৌধুরী, সানাউল হক, সরদার ফজলুল করিম, শহীদুল্লা কায়সার ও আরও অনেকে কেবল তাঁর ঘনিষ্ঠ জনই হয়ে ওঠেননি রণেশদা কখনও হয়েছেন তাদের শিক্ষক, কখনও বন্ধু ও সহকর্মী। তরুণদের মধ্যে রণেশদার এই উজ্জ্বল উপস্থিতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল।
১৯৪৮-এ ভাষা আন্দোলনের সূচনা লগ্ন থেকে ১৯৭৫ এর অক্টোবরে দেশত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত রণেশ দাশগুপ্তের বিশাল কর্মযজ্ঞ, এদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে বিশেষ কর্ম চাঞ্চল্য ও অুনপ্রেরণার সৃষ্টি করে। এখানে স্মরণযোগ্য বিষয় হল ‘৪৮ থেকে’৬৯-এর গণ অভুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত চার দফায় রণেশদা ১২ বছর কারাভোগ করেন। এর মধ্যে ছিল একটানা ৮ বছর কারাবাস। পঞ্চাশের মাঝামাঝি ২ বছর আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছে তাঁকে।
রণেশদার গণসংযোগ ও জনপ্রিয়তা ছিল অবিশ্বাস্যরকম। ১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৫৮) ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি’র ওয়ার্ড কমিশনার পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ইসলামপুর এলাকা থেকে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে রণেশ দাশগুপ্ত নির্বাচিত হন। ৩৫ টি পদের মধ্যে অন্য ৩৪টি পদে মুসলিম লীগ প্রার্থী অথবা ঢাকার সর্দাররা জয়লাভ করেন। রণেশদার কাছে মুসলিম লীগসহ ৬ জন প্রার্থী পরাজিত হন।
এই কালপর্বে রণেশদার বিশাল কর্মজীবন নিয়ে পৃথক আলোচনা করার অনুরোধ উদীচীর কাছে রাখছি। তবে এতোটুকু অন্তত বলতে হবে এ সময় সাংবাদিকতার মাধ্যমে, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দ্বারা, লেখনির মাধ্যমে তিনি আপমর মানুষের মুক্তির কথা বলে চলেন। একই সাথে তরুণদের ভাবনা-চিন্তাগুলোকে বুঝে নিয়ে নিজের ভাবনাগুলোকে তাঁদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে রণেশদা নিজেকে নিয়োজিত করেন। শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের কর্মীদের অনুপ্রেরণার মূল উৎস হন। স্বাধীনতার পরে, “বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী’রও হাল ধরেছিলেন। রণেশ দাশগুপ্তই সত্যেন সেন-প্রতিষ্ঠিত ‘উদীচী’র বেড়ে ওঠার ও শক্ত হয়ে ওঠার কাজটি পরম নিপুণতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিলেন। বাংলা একডেমি ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাহিত্য আলোচনায় মূল বক্তা হন। ঢাকার নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হন। কেন্দ্র থেকে থানা পর্যন্ত প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের প্রকাশনায় পরামর্শ ও লেখা দিয়ে তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করেন। ষাট ও সত্তরের দশকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একুশে সংকলন প্রকাশিত হত। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ সংকলনের নাম রণেশদা দিতেন। কি সব অসাধারণ নাম- ঝড়ের খেয়া, সূর্যজ্বালা, অরণি, নিনাদ। এ রকম আরও কত। একুশে সংকলনে লেখা চেয়ে রণেশদার কাছে তা পাওয়া যায়নি- এমনটা বোধ হয় কেউ-ই বলতে পারবে না। একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলছি। ১৯৭১-এর একুশে ফেব্র“য়ারি। পাকিস্তান আমলের শেষ একুশে। আমরা তখন গোপীবাগের রামকৃষ্ণমিশন রোডে থাকি। ‘তরঙ্গ গোষ্ঠী’ নামে গোপীবাগের এক সংগঠন প্রকাশ করলো ২১শে সংকলন। নাম ‘মুক্ত যে ভাবনা’। সে সংকলনে ‘ভাষা আন্দোলনের একটি মূল তাৎপর্য’ শিরোনামে রণেশদা একটি লেখা দিয়েছিলেন। ছোট ভাইয়ের কাছে রক্ষিত সে সংকলনে লিখে ছিলেন বিখ্যাত আরও কয়েক জন। নতুন করে আনন্দ দিল যে স্মৃতি তা হল আমাদের পরিবারের তিনজনের- বাবার, আমার ও ছোট ভাইয়ের লেখা ঐ সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল।
৬৩ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে রণেশদা ভারতের কলকাতায় চলে যান। সে সময় খুব দীর্ঘ প্রবাসে অবস্থান করার কোনো পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। তিনি রিটার্ন টিকেট করে গিয়েছিলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি, কারফিউ বলবৎ এবং মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির পুনর্বাসনসহ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রণেশদা কলকাতায় থেকে যান। ২২ বছর আর দেশে ফেরেন নি। তবে বাংলাদেশের সাথে বিশেষ করে তরুণদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্ক বজায় ছিল আমৃত্যু। ’৭৫ পরবর্তী রণেশদার জীবন-যাপন, লেখালেখি, সাহিত্য চর্চা ও কর্মপরিধিÑসে এক বিশাল ইতিহাস। সে পর্বের বিস্তারিত আলোচনা ভবিষ্যতে নিশ্চয় হবে। তবে রণেশদার তিরোধানের পর সহজেই উপলব্ধি করা গেছে তরুণদের মধ্যে তাঁর বার্তা কী অসীম জাগরণের সৃষ্টি করেছিল।
৪ঠা নভেম্বর ১৯৯৭ সালে দুপুরে কলকাতায় সাম্য ও কল্যাণের প্রতীক রণেশদা শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। তার মরদেহ কলকাতা থেকে স্বদেশে নিয়ে আসা হয়। আর মরদেহটি সর্বপ্রথম নিয়ে আসা হয় যশোরের উদীচী কার্যালয়ে। ৬ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকলস্তরের লোক সমাবেশের সাথে খেলাঘরের কিশোর সাথী, উদীচীর প্রবীন-নবীনেরা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-নাট্য জগতের কর্মীরা সশ্রদ্ধ অর্ঘ্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন এই শোক সমাবেশে।
অতি সাধারণ এবং অনুকরণীয় রণেশদা’র চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট তরুণদের চিরকাল আকৃষ্ট করবে। রণশদা আজীবন সমমত, ভিন্ন মত উভয় প্রকার কিশোর-তরুণ-যুবকসহ সকলের কাছে অত্যন্ত আপনজন ছিলেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় অল্প বয়সে বাঁচিতে থাকাকালীন অগ্নিযুগের বিপ্লবী যুবক হরিপদ দের সাথে পরিচিত হন এবং ‘তরুণ-সংঘে’ যোগদান করেন। অন্যদিকে কিশোর বয়সে তার জ্যাঠা লোক-সেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ঋষি নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্তের সাহচর্যও রণেশদা’র স্বদেশী ভাবনাকে যথেষ্ট উদ্ধুদ্ধ করে। এ দু’জনে বিপ্লবীর অনুপ্রেরণায় তিনি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে বিশ্বাসী ‘অনুশীলন সমিতি’র সদস্য হন। অন্যদিকে ‘যুগান্ত র’ দলের বিপ্লবী নেতা ডা. যাদু গোপাল মুখার্জী রণেশদাদের পারিবারিক চিকিৎসক ও বিশেষ আপন জন ছিলেন। যুগান্ত র দলও ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এ দু’দলের ভিতর যথেষ্ট রেষারেষি ছিল এবং কর্মীদের মধ্যে প্রায়শ: মনোমালিন্য দেখা দিত। রণেশদা ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁকে উভয় দলের কর্মীরা যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। এমন কি রণেশদা যুগান্ত র দল থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেছিলেন এমন ভুলধারণাও কারো কারো মধ্যে এক সময় হয়েছিল। মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার হিসেবে কাজ করার সময়ও বৈরী কমিশনারদের তিনি শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। আবার ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী কালে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম রত রণেশদা আতœগোপন অবস্থায় পুরনো ঢাকার উর্দুভাষী এক পরিবারে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি নিজেও খুব ভাল উর্দু জানতেন। তিনি কারাগারে থাকাকালীন জেলের উর্দুভাষী পাহারাদারদের কাছ থেকে উর্দু শব্দের সঠিক উচ্চারণ ও অর্থ জেনে নিতেন।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ, বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান এবং দ্বিতীয়ার্থে যখন স্বদেশে লেগেছে ভাষা আন্দোলনের জোয়ার, স্বাধিকার আদায়, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম তখন রণেশদা তরুণদের মধ্যে দেখেছেন ‘যৌবনের সজীবতা’ ও ‘প্রাজ্ঞের অভিজ্ঞতা’। তরুণদের নিয়ে রণেশদার চিন্তা-চেতনা গড়ে উঠেছে একদিকে মাঠে ঘাটে সকল বয়সী যুবা-তরুণদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে অন্য দিকে বিশ্ব সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ভুবনে বিচয়ণের মাধ্যমে। আমরা জানি তার পাঠের বিস্তৃতি অবাক করার মতো। অনেক জ্ঞানপিপাসু রয়েছেন যাঁরা নিয়ত পাঠের মধ্যে নিমজ্জিত আছেন। সে সব নমস্য ব্যক্তিরা অবশ্যই জ্ঞানী ও সমাজের বিশেষ সম্পদ। রণেশদা’র পাঠের সাথে রয়েছে চিন্তা-চেতনার ক্রম উন্নয়নের মাধ্যমে তা প্রয়োগ, পাঠ্য বিষয়ের বিশ্লেষণ। কখনো কখনো উদ্ধৃতির মাধ্যমে নিজের লেখার সমৃদ্ধ সাধান। এভাবেই তিনি এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা-আফ্রিকার শিল্পী-সাহিত্যিক চিন্তাবিদ, দার্শনিক-ইতহাসবিদদের মননশীল সৃষ্টির সাথে এদেশের তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করেছেন।
জনগণের ভ্রাতৃত্বের দাবী ও আদর্শকে সামনে রেখে তরুণ সমাজের মধ্যে প্রাচীন, আধুনিক ও ভাবীকালকে নিয়ে স্বচ্ছ চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটানোর জন্য রণেশদা চিরদিন বেঁচে থাকবেন।

১০.০৯.২০১১

তথ্যসূত্র:
১. সোমেন চন্দ রচনাবলী : সম্পাদনায় – বিশ্বজিৎ ঘোষ
২. বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন : অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়
৩. জীবনানন্দ দাশের কাব্য গ্রন্থ : ১ম খন্ড – ভূমিকা : নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
২য় খন্ড – ভূমিকা : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
৪. রণেশ দাশগুপ্ত স্মারকগ্রন্থ : সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ
বিশ্বজিৎ ঘোষ সম্পাদিত
৫. রণেশ দাশগুপ্ত: লালন : শাশ্বত ও বৈপ্লবিক
বিদ্যাসাগর : আধুনিক বিদ্রোহী রূপরঙ্গী
নজরুল কাব্য : প্রবাহের জঙ্গম বিচার
মার্কসবাদীদের চোখে জীবনানন্দ দাশ
দস্তয়েভস্কি : দিন বদলের পালায়
গিওর্গি লুকাচ : মার্কসীয় সৌন্দর্যতত্ত্বের অফুরন্ত খনি
৬. মুক্ত যে ভাবনা : ২১ শে সংকলন : তরঙ্গ গোষ্ঠী, গোপীবাগ,
২১ শে ফেব্রুয়ারি ৭১