Categories
প্রবন্ধ

চলে গেলেন বিশ্বপিতা রোলিহলাহলা নেলসন ম্যান্ডেলা : কাজী মোহাম্মদ শীশ

১২ লাখ ২১ হাজার ৩৭ বর্গ কিলোমিটারের ৫ কোটি ৩০ লাখ অধিবাসী অধ্যুষিত আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা, স্মরণকালের সারাবিশ্বের সর্বাধিক ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য মানবপ্রেমিক সংগ্রামী মানুষ নেলসন ম্যান্ডেলা পরিবার-পরিজন বেষ্টিত অবস্থায় নিজ ভবনে ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ গভীর রাতে পরলোকগমন করেন। তিনি গত ১৮ জুলাই ৯৫ বৎসরে পদার্পণ করেন। এ বছর অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার ম্যান্ডেলাকে কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। তার মৃত্যুতে সারাবিশ্ব শোকে মুহ্যমান। এ শোক চলবে দীর্ঘদিন। সেই সঙ্গে এই কিংবদন্তি সংগ্রামী মানুষটি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা থেকে কিভাবে বিশ্বপিতায় পরিণত হলেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তা জানার প্রয়াসী হবেন। ছোট-বড় পাহাড় ঘেরা দক্ষিণ আফ্রিকার একটি গ্রামের নাম এমতেজো। সংক্ষেপে ভেজো। সে দেশের অন্যতম প্রধান শহর জোহান্সবার্গ থেকে গ্রামটির দূরত্ব পাঁচশ’ মাইলের উপর। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর কেপটাউনের অবস্থান গ্রামটি থেকে আটশ’ মাইল পূর্বে। এই গ্রামে জন্ম ম্যান্ডেলার। তখন প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। পৃথিবী এক নতুন বিপ্লব দেখেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে বলশেভিকরা সে বিপ্লব ঘটিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে বর্ণবাদের শিকড় উপড়ে ফেলে শত শত বছরের ব্রিটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC) তখন ছয় বছরে পা দিয়েছে।
(সঠিক ইতিহাস হলো ১৯১২ সালে সাউথ আফ্রিকান নেটিভ কংগ্রেস(South African Native Congress) গঠন করা হয়। ১৯২৩ সালে পরিবর্তন করে তা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC)  নামকরণ করা হয়।) জন্ম নিলেন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই। পুরো নাম রোলিহলাহলা মাড়িরা ডাবিলুংগা ম্যান্ডেলা। (Rolihlalohla Madiba Dalibunga Mandela) তার বাবা হেনরি ম্যান্ডেলা। তার ছিল চার স্ত্রী। তৃতীয় স্ত্রী নোসিকেনির সন্তান হলেন ম্যান্ডেলা। হেনরি ম্যান্ডেলা ছিলেন থেমবু (Thembu) উপজাতির গোত্র প্রধান। এই উপজাতির ভাষা হলো জোসা (Xhosa)। হেনরি ম্যান্ডেলা ছিলেন স্বাধীনচেতা মানুষ। সাদা চামড়ার ম্যাজিস্ট্রেটের অন্যায় নির্দেশ তিনি প্রায়ই অমান্য করতেন। ফলে তাকে গোত্র প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ভূমিস্বত্ব বিলোপ আইন করে কালো আফ্রিকানদের কাছ থেকে যখন জমি কেড়ে নেয়া হয়েছিল তখন ম্যান্ডেলার বাবাও সেই আইনের শিকার হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয় যার ফলে হেনরির পুরো পরিবার পূর্ব পুরুষের আবাসস্থল ভেজো ছেড়ে কুনু নামে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হন।
ম্যান্ডেলার জীবনে একটা বিরাট প্রভাব ফেলেছিল আফ্রিকান গোত্র নেতাদের নানা মতাবলম্বী ব্যক্তি ও সম্প্রদায়কে একত্রে রাখার নেতৃত্ব প্রদানের দক্ষতা। তিনি দেখেছেন, একদিকে সংস্কারবাদী, রক্ষণশীল অন্যদিকে উদারপন্থি ঐতিহ্য রক্ষাকারীদের একত্রে সমাজবদ্ধ রেখেছেন গোত্র নেতারা।
ম্যান্ডেলার পড়াশোনা শুরু হয় খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে। এখানেই তার নামের সঙ্গে নতুন একটা নাম যুক্ত হয়। প্রথমদিন স্কুল শিক্ষিকা মিস ম্যাডিংগানা (Madingane)  ম্যান্ডেলাকে জিজ্ঞেস করেন-
‘তোমার নাম কি? ম্যান্ডেলার উত্তর, ‘রোলিহলাহলা’। শিক্ষিকার মন্তব্য, ‘এ নাম আমার পছন্দের নয়। তোমার একটা ক্রিশ্চান নাম থাকতে হবে।’ ম্যান্ডেলা বলেন, ‘আমার তেমন কোন নাম নেই।’ শিক্ষিকা জানান, ‘আজ থেকে তোমার নাম ‘নেলসন।’ সেই থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক এক মানবপ্রেমিকের নাম নেলসন ম্যান্ডেলা। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য হিল্ডটাউন শহরের কাছাকাছি ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ভর্তি হন। এখানে তিনি পরিচিত হতে থাকেন ছাত্রদের নানা সমস্যার সঙ্গে। কালোদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহসহ অন্যান্য অবিচার নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে বিক্ষোভ লেগেই থাকত। সাদা শাসকদের মনোভাব এমন ছিল যে, শহুরে ও গ্রাম্য ছাত্রদের মধ্যে বিবাদ, আদিবাসী বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরোধ ইত্যাদি কারণে এসব বিক্ষোভ হচ্ছে। ম্যান্ডেলা সমস্যার গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এ সময়ে তিনি ইউরোপের ইতিহাস- দেশে দেশে উপনিবেশিক শাসন, আফ্রিকার ভৌগোলিক অবস্থান- নানা গোত্র-ভাষার ঐতিহ্য এসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করেন। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে তিনি পরিচিত হন এবং শাসকশ্রেণীর বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগদান করেন। ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ভর্তির মাত্র এক বছর পর ১৯৪০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন। পরের বছর তিনি জোহান্সবার্গে চলে আসেন। সেখানে তিনি ইউনির্ভাসিটি অব সাউথ আফ্রিকার মাধ্যমে তার কোর্স সমাপ্ত করে ১৯৪২ সালে ব্যাচেলার ডিগ্রি লাভ করেন।
জোহান্সবার্গ ম্যান্ডেলার ভবিষ্যত রাজনৈতিক জীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্বর্ণখনির শহর এটি। দলে দলে কালো শ্রমিক এ শহরে কাজের খোঁজে ছুটে আসে। ২৩ বছরের যুবক ম্যান্ডেলা যখন এ শহরে পদার্পণ করেন তখন জোহান্সবার্গের বয়স ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। সাদা চামড়ার শাসকরা তাদের বসবাস, কাজকর্ম, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এসবের জন্য শহরটিকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা শুরু করে।
জোহান্সবার্গে এসে ম্যান্ডেলা উইটওয়াটার স্ট্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে অধ্যায়ন শুরু করেন। এ সময় কালো শ্রমিকদের ওপর সাদা শাসকদের বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ তাকে প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ক্রমশ তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) বর্ণবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটি দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। যুবক ম্যান্ডেলা এএনসি’র ‘ইয়ুথ লীগ’ নামে একটি শাখা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এএনসি ইয়ুথ লীগ এবং ১৯৫১ সালে ম্যান্ডেলাকে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট করা হয়। সাদা চামড়ার আধিপত্যের দল ন্যাশনাল পার্টি (N.P) ১৯৩৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে। এনপি’র শাসনামলে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষেরা ভীষণভাবে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়। কৃষ্ণবর্ণের বিভিন্ন গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও গোত্রকে পৃথক (Apartheid) করার জন্য নানাবিধ নির্যাতনমূলক আইন প্রণয়ন করা হয়। সব প্রকার নির্যাতনমূলক আইনের বিরুদ্ধে এএনসি ১৯৫২ সালে সারাদেশে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। ম্যান্ডেলা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন এবং ১৯৫২ সালে এই দলের চারজন ডেপুটি প্রেসিডেন্টের একজন হন। একই সময় তিনি ও তার বন্ধু অলিভার টাম্বো (Oliver Tambo) প্রথম কালো আইনজীবী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন পেশা শুরু করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালের পরবর্তী প্রায় চার বছর ধরে বহমান বিশ্বের দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যতকে যেমন প্রবাহিত করে তেমনি আন্দোলিত করে তোলে ম্যান্ডেলাকেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে গত শতাব্দীর চল্লিশ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট সরকারের সাফল্য এবং স্বাধীনতার দোরগোড়ায় ভারতের উপস্থিতি দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্টদের এবং সে দেশে বসবাসকারী লাখ লাখ ভারতীয়কে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। কমিউনিস্টরা গোড়ে তোলে দক্ষিণ আফ্রিকার খনি শ্রমিক ইউনিয়ন। খনি শ্রমিকদের ওপর নানা নির্যাতন, মজুরি বৃদ্ধি, থাকা-খাওয়া ও জীবনমান উন্নয়ন ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং ১৯৪৬ সালে ৭০ হাজার শ্রমিকের অংশগ্রহণে ধর্মঘট পালিত হয় কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে। এএনসি এই আন্দোলনে যোগদানের বিষয়ে নীরব থাকলেও ম্যান্ডেলা পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে কমিউনিস্ট নেতা জেবি মার্কসের সঙ্গে দেখা করে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের ওপর নির্যাতন ও প্রতিবাদের ইতিহাস অতি পুরাতন। ১৮৯২ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত আইনজীবী হিসেবে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে বর্ণবৈষম্য দূর করার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ভারতে যখন স্বাধীনতা আগত প্রায় তখন তার দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস এবং মহাত্মা গান্ধীর চিন্তা-দর্শন ও অর্জন সম্পর্কে জানার জন্য নেলসন ম্যান্ডেলা বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
ম্যান্ডেলা প্রত্যক্ষ করেন কিভাবে কমিউনিস্টদের দ্বারা পরিচালিত খনি শ্রমিক আন্দোলন এবং দক্ষিণ আফ্রিকান ভারতীয়দের আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করে ব্রিটিশের দোসর শ্বেতাঙ্গ সরকার।
আন্দোলনরত ৭০ হাজার শ্রমিকের ওপর বর্বর নির্যাতন নেমে আসে। বেয়োনেট চার্জ করে আন্দোলন ভেঙে দেয়া হয়। নিহত হন নয় শ্রমিক। আহত শত শত। শ্রমিকরা কাজে যোগদান করতে বাধ্য হন। শ্রমিকদের সংগঠিত ও ধর্মঘট করার অপরাধে ৫০ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। তাদের অনেককেই অর্থ ও কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। অন্যদিকে আফ্রিকার ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালে কুখ্যাত ‘এশিয়াটিক ল্যান্ড টেনিউর’ বিল পাস করা হয়। এই বিলের মাধ্যমে ‘ইন্ডিয়ান ঘেটো (Ghetto)অ্যাক্ট’ জারি করা হয়। এই অ্যাক্টের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের কাছে জমি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়।
কমিউনিস্ট ও আফ্রিকান ভারতীয়দের এই আন্দোলনগুলো ম্যান্ডেলা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কমিউনিস্টদের প্রবল সংগ্রামী প্রতিরোধের ধারা এবং আফ্রিকান ভারতীয়দের শান্তিপূর্ণ আইন অমান্য আন্দোলনের কর্মসূচি উভয়েই এএনসি ও ম্যান্ডেলাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের শুরুতেই শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবৈষম্যমূলক নিপীড়নের বিরুদ্ধে এএনসি আইন অমান্য ও অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলন ক্রমশ প্রবল আকার ধারণ করতে থাকে। আন্দোলনের নেতৃত্ব বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে জোহান্সবার্গে প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে সরকার অত্যাচার অব্যাহত রাখে ও আন্দোলন প্রতিরোধ করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে। এক সময় এএনসি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ম্যান্ডেলা অন্য সবার সঙ্গে একত্রে আফ্রিকানদের সংগঠিত করার জন্য নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ছোট ছোট ইউনিট করে এএনসি নেতা ও কর্মীরা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে তোলেন। ফলে বর্ণবৈষম্য ও জাতিগোষ্ঠীগুলোর মাঝে পৃথকীকরণের আইনের (Apartheid) বিরুদ্ধে আপামর জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়। ম্যান্ডেলার নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এই পরিকল্পনাকে ‘এম’ প্লান (M-Plan)  নাম দেয়া হয়।
এভাবে আন্দোলন এগিয়ে চলে। আসে মার্চ ১৯৬০ সাল। এএনসি-এর পাশাপাশি আরেক বর্ণবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী দল প্যান আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেস (PAC) আরও কঠোর কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলনের ডাক দেয়। তাদের আন্দোলনে বিশেষ প্রাধান্য পায় কালো মানুষদের একস্থান থেকে আরেক স্থানে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইস্যুকৃত পাসের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ গড়ে উঠছিল সেসব পরিচয়পত্রের বিরুদ্ধে যা কালো মানুষদের শুধু নির্দিষ্ট শহরে বা স্থানে অবস্থান করার অনুমতিপত্র হিসেবে বিবেচিত হত। কালোদের প্রতি এসব বৈষম্যের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে আইন অমান্য ও অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে। শাসকশ্রেণী কঠোর হাতে আন্দোলন দমনে নেমে পড়ে। সাদা চামড়ার পুলিশ এক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড- চালায় শার্পাভিলি (Sharpelille) শহরে ২১ মার্চ ১৯৬০ সালে। বিক্ষোভকারী জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালান হয়। ফলে নিহত হন ৬৯ জন এবং গুরুতর আহত হন ১৮০ জনের ওপর কালো মানুষ। শার্পভিলি হত্যাকা- দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে প্রচ- বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় তোলে। সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। এএনসি এবং প্যাকের বহু সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (অঘঈ) এবং প্যান আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেস (ANC) দল দুটোকে। সরকারের নিপীড়ন, নির্যাতন ও দমননীতির ফলে আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ আইন অমান্য অসহযোগ আন্দোলন থেকে সরে আসেন। এএনসি ঝুঁকে পড়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথে। দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলনে সংযোজিত হয় আর এক নতুন অধ্যায়। শার্পভিলির অমানবিক দমননীতি ম্যান্ডেলা ও এএনসিকে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে জাতিগোষ্ঠীগুলোর মাঝে পৃথকীকরণ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সাফল্য সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। ম্যান্ডেলা ও তার দল নতুন পথের সন্ধান খুঁজতে থাকে। ম্যান্ডেলার চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, তিনি তার সব চিন্তা-চেতনা-মনন-বিকাশ-প্রতিবাদ-সমঝোতায় দক্ষিণ আফ্রিকার শ’ শ’ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন করতেন। পৃথিবীর কোন দেশেরই সব রাজনৈতিক মতবাদ ও পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ বর্জন করতেন না। আবার হুবহু গ্রহণও করতেন না। বিষয়ের গভীরে পৌঁছে দক্ষিণ আফ্রিকার নিজস্ব ঐতিহ্যকে বিশ্ব মানবমুক্তির আন্দোলনের পানে ধাবিত করতেন। এ সময় তিনি আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা-এশিয়া-পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যায়ন করেন। জানার চেষ্টা করেন নানা দেশের সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাস। ক্রমশ তার কাছে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি প্রবাদ ধ্রুব সত্য হিসেবে উপস্থিত হয়, ‘বন্য জন্তুর আক্রমণ খালি হাতে মোকাবিলা করা যায় না।’ সত্য বলে মনে হয় বন্য শ্বাপদের থাবার ন্যায় শ্বেতাঙ্গ সরকারের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র পথ সশস্ত্র লড়াই। এএনসির একটি সামরিক শাখা গঠন করা হয়, তাদের ভাষায় যার নাম দেয়া হয় ‘আমখোন্ড উই সিজ্যুই’ (Umkhonto we siæwe) যার অর্থ হলো ‘জাতীয় বর্শা’ (Spear at the Nation)। ম্যান্ডেলা জাতীয় বর্শার ‘কমান্ডার ইন চিফ’ নিযুক্ত হন। সংক্ষেপে এই বাহিনীকে ‘এমকে’ নামে ডাকা হতো। ম্যান্ডেলা গ্রেফতার এড়ানোর জন্য আত্মগোপনে যান এবং নানা ছদ্মবেশে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন, অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনথ আন্দোলনকারী ও তাদের নেতাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, মত বিনিময় করা এবং সর্বোপরি হাতে-কলমে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তাঞ্জানিয়া, ইথিওপিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, কায়রোর (মিসর), লিবিয়া, ঘানা, মালি, সেনেগাল, মরক্কো, মোজাম্বিক, এঙ্গোলাসহ আফ্রিকার প্রায় সব দেশ সফর করেন। এই সফরের এক পর্যায় ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার বাইরে পাহাড় ঘেরা এক স্থানে ম্যান্ডেলা অস্ত্র চালনা ও গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হাতে তুলে নেন পিস্তল ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। দীক্ষা গ্রহণ করেন অস্ত্র দিয়ে শত্রু মোকাবিলা করার। কঠোর অনুশীলনী, নিয়মানুবর্তিতা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করেন ম্যান্ডেলা। বোমা তৈরি, মর্টার ছোড়া, গহীন বনে অথবা পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে থেকে অকস্মাৎ শত্রু বাহিনীকে ঘায়েল করার সামরিক নিয়মকানুন বিষয়ে অধ্যায়নে ব্রতী হন। এভাবেই নেলসন ম্যান্ডেলা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য নিজেকে কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে গড়ে তোলেন।
ম্যান্ডেলা ও আরও অনেক প্রশিক্ষিত সহযোদ্ধা দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বত্র সশস্ত্র গেরিলা সংগ্রাম ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস নেন। ম্যান্ডেলাকে ছদ্মবেশে দাড়ি রেখে গোপনে সশস্ত্র প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিতে হয়। প্রতিরোধ যখন জোরদার হচ্ছে তখন ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে ম্যান্ডেলা গ্রেফতার হন। ইতিপূর্বে অসহযোগ আন্দোলনের সময়েও ম্যান্ডেলাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তবে এবার তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দেশত্যাগ, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা-, সশস্ত্র হামলা ও দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তাকে চিহ্নিত করা হয় কমিউনিস্টদের সহিংস আন্দোলনের সহযোগী হিসেবে।
গ্রেফতারের পর ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহ্যকে স্মরণ করে আদিবাসী জোশা যোদ্ধাদের বাঘের চামড়ার পোশাক পরে আদালতে উপস্থিত হন। ম্যান্ডেলা আদালতকে বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মই বলবে আমি নির্দোষ ছিলাম। আর এই আদালতের বাইরে এখনকার সরকারের সদস্যরাই দোষী প্রমাণিত হবে।’ তিন যুগ পরে তার এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়।
ম্যান্ডেলার বিচার কাজ শুরু হলে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তার আইনজীবী বন্ধু ও বন্দী সহযোদ্ধাদের সহযোগিতায় তিনি নিজেই আইনজীবীর কাজটি করেন। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ম্যান্ডেলা যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন সারা পৃথিবীর জন্য তা এক অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে। দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে আদালতে উপস্থিত সবাইকে তিনি সম্মোহিত করে রাখেন। তার রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা, মানবতার প্রতি বিশ্বাস, দক্ষিণ আফ্রিকার আদিবাসীদের জীবন, বহু গোত্র-জাতি-সংস্কৃতির মিলন প্রচেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত থাকার ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান শাসকশ্রেণীর নির্মম অত্যাচার ও ভয়াবহ আক্রমণকে অহিংস আন্দোলন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর তাই সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। জানিয়ে দেন তিনি এএনসি সামরিক শাখার এমকে’র নেতা। কমিউনিস্টদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সব মানুষের মুক্তির সহায়ক বলে বর্ণনা করেন। তবে তিনি নিজে কমিউনিস্ট নন। ব্রিটিশ আমেরিকার ন্যায় সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর তার আস্থা আছে। তিনি জানান আফ্রিকানরা যতদিন নিরাপদে আত্মসম্মান নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করার নিশ্চয়তা পাবে না ততদিন এএনসি তাদের মুক্তির আন্দোলন চালিয়ে যাবে। তার বক্তব্যের শেষভাগে তিনি বলেন, তার লড়াই কেবল শ্বেতাঙ্গ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেই নয়, কৃষ্ণাঙ্গ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেও। তার স্বপ্ন সব মানুষকে একইভাবে বিচার করে সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পরিবেশ সৃষ্টি করা। গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকায় সব বর্ণ-গোত্র-জাতি-ধর্ম বিশ্বাসী লোকেরা সমমর্যাদা নিয়ে মিলেমিশে একত্রে বসবাস করবে-এটাই তার স্বপ্ন।
এই বিচার চলাকালে ম্যান্ডেলার মানবমুক্তির ডাক সারাবিশ্বকে আলোড়িত করে এবং দেশে দেশে বর্ণ বিদ্বেষবাদীদের বিরুদ্ধে মুক্তিকামীদের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। তার বিরুদ্ধে আনীত দেশদ্রোহিতার মামলার রায়ে তাকে যেন মৃত্যুদণ্ড- না দেয়া হয় বিশ্বমত সেভাবে গঠিত হতে থাকে।
দীর্ঘদিন বিচার চলার পর ১৯৬৪ সালের জুন মাসে বিচারের রায়ে নেলসন ম্যান্ডেলাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়। রবেন আইল্যান্ডের নির্জন কারাগারে তার এই বন্দীজীবন কাটাতে হয়।
মোট ২৭ বছর কারাভোগের মধ্যে ১৮ বছরেরও বেশি সময় নেলসন ম্যান্ডেলা রবেন আইল্যান্ডের নির্জন সেলে বন্দী ছিলেন। ম্যান্ডেলার সেই বন্দী জীবনের দীর্ঘ কাহিনী পৃথকভাবে লেখার ইচ্ছা রইল। তবে বছরের পর বছর নির্জন যে সেলে একাকী ম্যান্ডেলা ছিলেন সেটি কিরূপ তা আমরা জানতে পারি, ৮ ফুট দৈর্ঘ্য ৭ ফুট প্রস্থের একটি ছোট ঘর। সামনে লোহার শিকযুক্ত দরজা। উল্টোদিকে দেয়ালের অনেক উপরে ছোট্ট একটি জানলা। অন্য দু’দিক বন্ধ দেয়াল। মেঝের এক পাশে কম্বল বিছানো শয্যা। মাথার কাছে আরও দুটি কম্বল পেঁচিয়ে রাখা। একটি বালিশ হিসেবে ব্যবহার করার এবং অন্যটি গায়ে জড়ানোর জন্য। একটা টুলের আকারের টেবিলের ওপর রাখা আছে ধাতুর তৈরি থালা ও বাটি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী প্রতিরোধ ও দুর্জয় আন্দোলন অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ এমন আকার ধারণ করে যে ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের প্রেসিডেন্ট এফ. ডব্লিউ. ডি ক্লার্ক আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য সে বছরই ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।
দিন-রাতের গণনায় প্রায় দশ হাজার দিন, বছরের গণনায় ২৭ বছর কারাবাসের পর মুক্ত ম্যান্ডেলা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার নয় সারাবিশ্বের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে সে সময়টা ছিল ৪০০ বছরের সংখ্যালঘু সাদা চামড়ার অত্যাচার থেকে কালো চামড়ার মানুষদের মুক্তি। স্বাধীনতা প্রাপ্তি। কিন্তু এই মহান ব্যক্তিটি তখন সভ্যতা স্বাধীনতা জীবনবোধ নিয়ে কি ভাবছেন? তার মুক্তি ও বিজয় উপলক্ষে জোহান্সবার্গের শহরতলীতে কার্লটন হোটেলে তাকে দেয়া এক সংবর্ধনায় নেলসন ম্যান্ডেলা স্বাধীনতার দীর্ঘ পথের (Long walk to Freedom) দর্শন কত সহজেই তুলে ধরেছেন। বন্দীজীবন নিয়ে তিনি বলেন, ‘… দীর্ঘ ও একাকী জীবনের সেই সব বছরগুলোতে আমার নিজের লোকদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সাদা ও কালো সব মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়। আমি জানি অত্যাচারিতকে মুক্ত করতে হবে, ঠিক একইভাবে অত্যাচারীকেও মুক্ত হতে হবে। যে মানুষ অন্য মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে, সে ঘৃণার কাছে বন্দী, সে কুসংস্কার ও ক্ষুদ্র মনের কারাগারে বন্দী রয়েছে। যখন আমার কাছ থেকে আমার স্বাধীনতা হরণ করা হয় তখন যেমন আমি মুক্ত নই, অন্যের স্বাধীনতা যদি আমি হরণ করি, তখনও আমি সত্যিকারের মুক্ত নই। অত্যাচারিত ও অত্যাচারী উভয়েই তাদের মানবিকতা খোয়ায়।
জেল থেকে বেরিয়ে অত্যাচরিত ও অত্যাচারী উভয়কে স্বাধীন করার ব্রত আমি নেই। কেউ কেউ মনে করেন সেটা অর্জন করা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি তা সঠিক নয়। সত্য হলো, আমরা এখনও মুক্ত নই, মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা শুধু স্বাধীনতা অর্জন করেছি, অত্যাচারিত না হওয়ার অধিকার পেয়েছি। শৃঙ্খলের অবসানই কেবল মুক্তি নয়। সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা এবং অন্যের স্বাধীনতাকে সমৃদ্ধ করাই মুক্তি। স্বাধীনতার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা ও সত্যিকারের পরীক্ষা কেবল শুরু হলো। ….’
ম্যান্ডেলার মুক্তির পর আলোচনার প্রাথমিক পর্যায় শ্বেতাঙ্গ সরকার ৩টি শর্ত দেয়। এক. এএনসিকে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিহার করতে হবে। দুই. কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। তিন. সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের দাবি পরিহার করতে হবে। ম্যান্ডেলা শর্ত মানতে অপারগতা জানিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন। এক. কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষমতার অংশীদারিত্বে দাবি না মানা পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ করার শর্ত বাস্তবসম্মত নয়। দুই. এএনসি কমিউনিস্ট নিয়ন্ত্রিত দল নয়, জনগণের সপক্ষে একই শত্রুর সঙ্গে লড়াই করার সংকল্প যে সব দলের রয়েছে এএনসি তাদের বন্ধু মনে করে। কারও উপদেশে দীর্ঘদিনের বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নিশ্চয় কোন মানুষের জন্য মর্যাদাকর নয়। তিন. সব প্রকার দ্বেষ-বিদ্বেষ, হানাহানি দূরকরণ ও অভ্যন্তরীণ শান্তি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ব্যবস্থা মেনে নেয়া।

এপ্রিল ২৭, ১৯৯৪-এ বর্ণবাদ-জাতিভেদহীন প্রথম অবাধ নির্বাচনে নেলসন ম্যান্ডেলা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যেন কোন আতঙ্ক সৃষ্টি না করে ম্যান্ডেলার নেতৃত্বের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল সেটা। এ ছাড়াও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিশেষ করে জুলু ও ইনকাথা সম্প্রদায়ের সঙ্গে এএনসির সংঘর্ষেল অবসান ঘটানও ছিল আর একটি চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয়ে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল সব শক্তির মধ্যে সুসঙ্গত ঐক্য স্থাপন। ম্যান্ডেলা এএনসি, সহযোগী অন্যান্য সংগঠন এমনকি প্রতিপক্ষকে নিয়ে সরকার গঠন করেন। সরকার পরিচালনায় নতুন সরকার যথেষ্ট দক্ষতা প্রদর্শন করে। ম্যান্ডেলা ও তার সহযোগীরা অর্থনেতিক ক্ষেত্রে যে অর্ন্তদৃষ্টি এবং আধুনিক সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছ ধারণা ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে তা পূর্ববর্তী সরকারের শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ককে বিস্মিত করে। নতুন সরকার অল্প সময়ের মধ্যে জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, বয়স এসবের মধ্যে পার্থক্য বা ভেদাভেদ দূর করে সংবিধান রচনা করে। সংবিধানে অত্যন্ত অগ্রসর মানবিক মূল্যবোধের সন্নিবেশ করা হয় মৃত্যুদণ্ডা উঠিয়ে দিয়ে।
এরপর নেলসন ম্যান্ডেলা পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ম্যান্ডেলা ১৯৯৬ সালে জানিয়েছিলেন যে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না। তার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ম্যান্ডেলা ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে আফ্রিকান কংগ্রেসের দলনেতার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। থাবো এমবেকি এএনসির প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে এএনসি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে জয়লাভ করে। এমবেকি হন দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন প্রেসিডেন্ট। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন জ্যাকব জুমা। এএনসি ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট থেকে সরে এসে নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দাতব্য এবং জনসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। রবেন আইল্যান্ডে বন্দী জীবনে তাকে দেয়া কয়েদি নাম্বার ৪৬৬৬৪ অনুসারে শুরু করে দিয়ে গেছেন এইডস প্রতিরোধ ক্যাম্পেইন। নব্বই ঊর্ধ্ব বছর বয়সেও বিশ্বের মানুষের কাছে নিরন্তন ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন এই বার্তা, ‘আমাদের কাজ এখনও শেষ হয়নি। যেখানেই মানবতা নির্যাতিত হচ্ছে সেখানেই আরও অনেক কাজ করার আছে। আমাদের কাজ হলো, সবার জন্য স্বাধীনতা নিয়ে আসা।’
বিংশ শতাব্দীজুড়ে তো পৃথিবীর একের পর এক দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশে দেশে মানুষ তার হৃত অধিকার ফিরে পেয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকাকে ম্যান্ডেলা যেভাবে সবরকম দুর্যোগ থেকে মুক্ত করে একটি সুসঙ্গত ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছে তার কি দ্বিতীয় উদাহরণ আছে?
তার এই সাফল্যের পিছনে কি শুধুই রাজনৈতিক বিচক্ষণতা কাজ করেছে? নাকি তার চরিত্রের সরলতা ও মানবতাবোধ তার মাঝে বিরল এক নৈতিক বল ও সত্যের প্রতি অবিচল থাকার শক্তি জুগিয়েছে। এই পৃথিবীতে আজ ধারাবাহিকভাবে নির্ভরযোগ্য মানবিক গুণসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া বড়ই কঠিন। নেলসন ম্যান্ডেলা এসেছিলেন আমাদের কাছে সেই ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হয়ে। বিশ্ববাসীর সঙ্গে আমরাও তার মৃত্যুতে গভীর শোকাতুর। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।