Categories
প্রবন্ধ

উদীচী : বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার উদীচী প্রতিষ্ঠার পটভূমি

উদীচী : বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার
উদীচী প্রতিষ্ঠার পটভূমি
১৯১৭ সালে সোভিয়েত বিপ্লবের বিজয়ের পর বিশ্ববাসী নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে শোষণমুক্তির। বুঝতে শুরু করে  পুঁজির শৃঙ্খল তাহলে শেষ কথা নয়। নতুন যুগের ভোরে বিশ্ববাসী জেগে উঠতে শুরু করে। শামিল হয় জাগরণের মিছিলে। সে মিছিলে যোগ দেয় ভারতবর্ষের মানুষেরাও। সে মিছিল প্রগতির মিছিল। আর মিছিলের মানুষদের অভিধা হয় প্রগতিশীল। এক নতুন আলোকে বিশ্বটাকে এরা দেখতে পায় নতুন করে। গড়ে ওঠে নতুন শিল্প – সাহিত্য – কবিতা – গান – নৃত্য – নাটক – চলচ্চিত্র – চিত্রকলা ভাস্কর্য – বিশ্ববীক্ষণের এই নতুন আবেগে। এই নতুনধারার শিল্পকলা বিকশিত হয় কোথাও-প্রগতিশীল রাজনীতির অগ্রগামী, কোথাও সহগামী আবার কোথাও অনুগামী হয়ে।
এরই ধারাবাহিকতায় চল্লিশের দশকে ভারতবর্ষে একে একে গড়ে ওঠে ণড়ঁঃয’ং ঈঁষঃৎধষ ওহংঃরঃঁঃব, সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি, প্রগতি লেখক সংঘ, ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রভৃতি। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ-এর ঢাকা শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৯ সালে। এর নিয়মিত সদস্য ছিলেন সতীশ পাকড়াশী, সোমেন চন্দ, রণেশ দাশগুপ্ত, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, সত্যেন সেন, পরবর্তীকালে মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম। এদের মধ্যে দুজন সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্ত উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা এবং দুজন মুনীর চৌধুরী (শহীদ) ও সরদার ফজলুল করিম উদীচীর অন্যতম উপদেষ্টা। এঁদের সবারই যোগ ছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে।
সত্যেন সেন উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। রণেশ দাশগুপ্তের ভাষায় – বিপ্লবী নয়া ধ্র“পদী গণকথাশিল্পী সত্যেন সেন ‘উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তি ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থানে যাঁরা নিরন্তর (বর্তমান শতকের প্রায় গোড়া থেকে আশির দশক পর্যন্ত) একটার পর একটা দায়িত্ব পালনে ব্রতী ও উদ্যোগী থেকেছেন’ সেই কর্মীদেরই একজন। রণেশ দাশগুপ্ত যদিও নিজের কথা বলেন নি, কিন্তু আমরা জানি – তিনিও তা-ই ছিলেন। এই চেতনাই ছিল সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্তের জীবন ও শিল্পবোধের কেন্দ্রীয় প্রেরণা।
এই প্রেরণার তাগিদেই সত্যেন সেন ১৯৪০ সনে নারী আত্মরক্ষা সমিতির জন্য গান লেখেন – “ওঠো ভারতের নারী” (সূত্র : শ্রীমতি নিবেদিতা নাগ), ১৯৪২ সালের নভেম্বরে লেখেন “লীগ কংগ্রেস এক হও”, ১৯৪৩ এ দুর্ভিক্ষের উপর বেশ কিছু জনপ্রিয় গান লেখেন, যার একটি ‘চাউলের মূল্য চৌদ্দ টাকা, কেরোসিন তেল নাইরে, কী করি উপায়’। একই প্রেরণায় ১৯৪৬ সালে কমরেড ব্রজেন দাশের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কবিয়াল দল গঠন করেন। ইতোমধ্যে ১৯৪৩ সনে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং ১৯৪৪ সনে গণনাট্য সংঘের স্বতন্ত্র বাংলা শাখা গঠিত হয়েছে সেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শেরই প্রেরণায়। সেই একই উদ্দেশ্যে সত্যেন সেন গঠন করেন উদীচী – কিন্তু সে অনেক পরের কথা।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীলদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের স্টিম রোলার। এসময় প্রগতিশীলরা গড়ে তোলেন ‘শিখা’ গোষ্ঠী এবং বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। সত্যেন সেন ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর ১৯৪৯ পর্যন্ত আত্মগোপনে, ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত কারান্তরালে থাকতে বাধ্য হন।
এত নির্যাতনের মধ্যেও কৃষকদের ও শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্টরা কাজ করে চলেছেন। এমনি একজন সর্বস্বত্যাগী নেতা ছিলেন সত্যেন সেন। তিনি কাজ করতেন কৃষকদের মধ্যে। তিনি কাজ করতে গিয়ে দেখলেন বক্তৃতার চেয়ে কৃষকদেরকে গান দিয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করা যায়। তিনি চল্লিশ পঞ্চাশের দশকে অজস্র গণসঙ্গীত লিখেছেন, সুর করেছেন, গেয়েছেন। নিজে ছিলেন শিল্পী। পাশাপাশি নিকট অতীতেই ছিল গণনাট্য সংঘের অভিজ্ঞতা।
১৯৫৬’র ঢাকা জেলা কৃষক সম্মেলন থেকে সত্যেন দা এমন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরির তাগিদ হৃদয়ে লালন করেন- যে সংগঠন গান, নাটকের মধ্যে দিয়ে সমাজ ও সংস্কৃতি বদলের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সেই আদর্শ সামনে রেখে কিছু উৎসাহী তরুণের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন “সৃজনী সাহিত্য ও শিল্পীগোষ্ঠী”। এর পর তিনি একটি গানের দল তৈরি করলেন ১৯৫৮ সালে। এই দল তৈরি করার পর পরই সত্যেন সেন কারারুদ্ধ হন এবং বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে জেলে কাটাতে হয়। কিন্তু তাঁর তৈরি এ দলটির কর্মকাণ্ড টিকে থাকে। গানে এ দলের হাল ধরেন গোলাম মোহাম্মদ ইদু ও সাইদুর রহমান। সাথে ছিলেন আবদুল করিম, আবদুল খালেক প্রমুখ। শিল্পী জাহিদুর রহিম মাঝে মাঝে এই দলটির সাথে যুক্ত হতেন। এর সাথে যুক্ত হন সৃজনীর শুভ রহমান, মোজাম্মেল হোসেন মন্টু, আবেদ খান, নিয়ামত হোসেন, ইউসুফ পাশা, ইয়াহিয়া বখত প্রমুখ। এঁরা সবাই ছিলেন লেখক সাহিত্যিক কবি ও গল্পকার। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত এই নামহীন দলটি বিভিন্ন কৃষক সমাবেশে ও শ্রমিক জমায়েতে গান গেয়েছে। ১৯৬৫-৬৭ তে এর সাথে যুক্ত হন বদরুল আহসান খান, মোস্তফা ওয়াহিদ খান, রাজিয়া বেগম, আখতার হুসেন, পারভেজ শামসুদ্দিন, মজনু মনির প্রমুখ। এ দলের গানগুলোর বেশির ভাগই ছিল বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের গান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের দেশ পর্যায়ের গান, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের তৎকালীন প্রচলিত কিছু বাংলা ও হিন্দী গণসঙ্গীত এবং সত্যেন দার নিজের লেখা ও সুর করা গান।
প্রথমে নারিন্দায় সাইদুর রহমানের বাসায় মহড়া শুরু হয়। স্থানীয় ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে পরে মুক্তধারা, আবেদ খানের বাসা, হাশেম খানের বাসা, স্বপন ভাবীর বাসা সর্বত্রই প্রায় একই অভিজ্ঞতার পর শান্তিনগরে পীর হবিবুর রহমান মোর্শেদ আলী ও মোনায়েম সরকারের মেস যা ন্যাপের মেস নামে পরিচিত ছিল- সেখানে দলটি উঠে আসে। এই বাসাটি রহিমা চৌধুরানীর বাসা ছিল। এখানে মসজিদ কমিটি মহড়ায় আপত্তি জানালে দলটির শুভানুধ্যায়ীরা পাল্টা হুমকি প্রদান করেন এবং দলটির বিরুদ্ধে মসজিদে প্রচারিত ইসলামী ছাত্র সংঘের লিফলেট কেড়ে নেন। এতে কাজ হয়। এ সময় একদিন সত্যেন দা দলটির নামকরণের প্রস্তাব দেন এবং নিজেই নাম রাখেন “উদীচী”।
প্রতিষ্ঠাকাল:
পাকিস্তানি শাসন শোষণের বিরুদ্ধে যখন ফুঁসে উঠছিল বাংলার আপামর মানুষ। একটি কালজয়ী গণঅভ্যুত্থান উঁকি ঝুঁকি মারছে। এমনি সময় ঢাকা তথা গোটা বঙ্গদেশের গণসংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক ঔপন্যাসিক সত্যেন সেনের নেতৃত্বে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (২৯শে অক্টোবর, ১৯৬৮)। সত্যেন সেনের মত নিবেদিতপ্রাণ আদর্শবাদী, সৎ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নেতৃত্বের জন্যে উদীচী দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। গণনাট্য আন্দোলনের সময় যেমন ব্যাপকসংখ্যক বুদ্ধিজীবী শিল্পী সাহিত্যিক তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, বাংলাদেশে উদীচীর ক্ষেত্রেও কতক পরিমাণে সেটাই সম্ভব হয়েছে।
একজন ভাষ্যকার লিখেছেন “বাংলাদেশে নব সংস্কৃতি বিশেষতঃ গণসংগীতের ক্ষেত্রে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনা”। কেবলমাত্র গণসঙ্গীত নয়, বলা চলে বাংলাদেশে গণসংস্কৃতি চর্চায় ‘উদীচী’ এক অনন্য সৃষ্টি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, সুরকার, গীতিকার ও শিল্পী সংগ্রামী সর্বজন শ্রদ্ধেয় সত্যেন সেন ছিলেন উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা। উদীচীর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হওয়ার পূর্বে যে আহবায়ক কমিটি গঠিত হয় তার আহবায়কের দায়িত্ব দেয়া হয় কামরুল আহসান খানকে।
সদস্যবৃন্দ ছিলেন সত্যেন সেন, গোলাম মোহাম্মদ ইদু, মোস্তফা ওয়াহিদ খান, ইকরাম আহমেদ, আখতার হুসেন, বদরুল আহসান খান, রাজিয়া বেগম, মঞ্জুর মোরশেদ প্রমুখ।

প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিম্নরূপ
সভাপতি     :    সত্যেন সেন
সহ-সভাপতি    :    গোলাম মোহাম্মদ ইদু
সাধারণ সম্পাদক    :    মোস্তফা ওয়াহিদ খান
সহ-সাধারণ সম্পাদক    :    ইকরাম আহমেদ
অন্যান্যরা ছিলেন রাজিয়া বেগম, ইকবাল আহমেদ, আখতার হুসেন, মাহফুজ আলী মল্লিক, তাজিম সুলতানা প্রমুখ।
উদীচী কেন অন্য সংগঠন থেকে আলাদা
উদীচী শুধুই একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়। উদীচী একটি আন্দোলন। উদীচী কেবল সংস্কৃতিচর্চা করে না, গণমানুষের সংস্কৃতি চর্চার পথ নির্দেশও করে। সত্যেন দা খুব সচেতনভাবেই উদীচী নামটি নির্বাচন করেছিলেন। ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, উদীচী অর্থ উত্তর দিক, বা ধ্র“বতারার দিক। দিকহারা নাবিকেরা যেমন উত্তর দিকে ধ্র“বতারার অবস্থান দেখে তাদের নিজ নিজ গন্তব্য স্থির করেন- তেমনি এদেশের সংস্কৃতি তথা গণমানুষের সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সবকিছুই উদীচীকে দেখে তার চলার পথ চিনতে পারবে। এ জন্যেই উদীচী অপরাপর সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে আলাদা।
উদীচী দেশ ও জনগণের আশা আকাক্সক্ষাসমূহকে উপলব্ধি করবে, তাদের দুঃখ-কষ্টের কারণ সমূহকে উদঘাটন করবে এ সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করবে, তাদেরকে এই দুঃখ কষ্টের কারণসমূহ মোকাবেলা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা যোগাবে, এভাবে দেশ ও জনগণের ইতিহাসের ক্রান্তিকাল সমূহ সৃষ্টি করবে তা অবলোকন (গড়হরঃড়ৎ) করবে- তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে পরিণতির দিকে এবং আবার তাদেরকে নতুনতর সংগ্রামের জন্য তৈরি করবে। এসবই করবে উদীচী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
উদীচী সমাজ সচেতন, সমাজ পরিবর্তনের নিয়মসমূহ ও কারণসমূহ সম্পর্কে সচেতন। উদীচীর কর্মীরা শুধু নিজেরাই সচেতন হওয়া নয়, জনগণকেও সচেতন করাকে কর্তব্য মনে করে। মানুষের প্রতি এই কমিটমেন্টের জন্যই উদীচী আর সবার থেকে আলাদা।
উদীচীর গাওয়া গানের ধরণ
উদীচী মূলতঃ গণসঙ্গীতের সংগঠন। বৃহত্তর মানব গোষ্ঠী তথা মেহনতী মানুষের উপর মুষ্টিমেয় শোষকের অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমূলক এই সকল গান। এসকল গানে থাকে শোষণের স্বরূপ উদঘাটন শোষকের স্বরূপ এবং শোষণ থেকে মুক্তির জন্য সংগঠিত আন্দোলনের প্রণোদনা। কারণ উদীচী মনে করে সমাজ সংস্কৃতির প্রকৃত নির্মাতা জনগণ। অথচ তারাই সমাজ সংস্কৃতির সকল প্রকার সুফল থেকে বঞ্চিত থাকে। এই বঞ্চিত মানুষের হাতে তাদের শ্রমের সার্বিক ফসল তুলে দেয়ার পরিবেশ রচনা করতে হলে বর্তমান শোষণমূলক সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন দরকার। আবার এই ইতিবাচক পরিবর্তন গণমানুষের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়। সে কারণেই গণমানুষকে আপন অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং তা আদায়ে সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার প্রেরণা দেয় উদীচী।
উদীচীর গাওয়া গান শুধুমাত্র বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করে না- সাধারণ মানুষের সহজবোধ্যতার দিকেও লক্ষ্য করে। তাই উদীচীর গানকে জনগণের সহজবোধ্য ভাষায় এবং তাদের প্রাণের সুরকে অবলম্বন করেই রচনা করার চেষ্টা করা হয়।
উদীচীর বিশেষ অবদান
ক. গণসঙ্গীতের চর্চা ও বিকাশে উদীচী: জন্মের অঙ্গিকারে আবদ্ধ হয়ে উদীচী জন্ম লগ্ন থেকেই দুঃখ-দুর্দশা এবং অধিকার সম্পর্কে মানুষকে গণসঙ্গীতের মাধ্যমে সচেতন করে আসছে। উদীচীর গণসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে বারবার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে কৃষকের ভাতের দাবী, শ্রমিকের শ্রমের ন্যায্য দাবীর কথা। শুধু তাই নয় দেশ এবং দেশের মানুষ যখনই সংকটময় অবস্থার মধ্যে পড়েছে তখনই উদীচীসহ অপরাপর সংগঠনের পরিবেশনায় গণসঙ্গীত গণমানুষকে পথ চলতে প্রেরণা যুগিয়েছে, সাহস দিয়েছে। স্বাধীনতার পরও দেশিয় দখলদার-মজুতদার-মুনাফাখোর, কালোবাজারীরা যখন বিনষ্ট করতে চেয়েছে দেশের সম্মান, আপনস্বার্থে বিকিয়ে দিতে চেয়েছে দেশের সম্পদ তখনও তার বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পীরা গেয়ে উঠেছে গণসঙ্গীত। উজ্জীবিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল।
গণসঙ্গীতের এই ধারার আরো বেশি বিস্তার ঘটানো, গণসঙ্গীত যাতে আরো বেশি শ্রমজীবী মানুষকে উজ্জীবিত করতে পারে, তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারে, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে শিল্পীরা যাতে এসকল বঞ্চিত-নিপীড়িত-শোষিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে সে লক্ষ্যে উদীচী ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে এসেছে। ১৯৭৪ সালে ন্যাপ অফিসে উদীচী সাতদিন ব্যাপি আয়োজন করে গণসঙ্গীত প্রশিক্ষণের।  প্রতিটি শাখা থেকেই শিল্পীরা সে প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। প্রায় ১২৫-১৩০ জন শিল্পী এ প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন আব্দুল লতিফ, লুৎফর রহমান, সুখেন্দু চক্রবর্তী, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, সনজিদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, ম. হামিদ প্রমূখ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সবচেয়ে বড় স্টুডিওটি তখন নতুন তৈরি হয়। এখানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় উদীচীর এ শিল্পীদের নিয়ে। এ প্রশিক্ষণ থেকে ক্রান্তিকালের গান নামক একটি সংকলন বের করা হয়। ১৯৮৯ সালে আইপিসিএ-এর একটি কালারাল ফেস্টিভালে রুহুল হক খোকার নেতৃত্বে ৩৮-৪২ জনের একটি দল কলকাতায় গণসঙ্গীত পরিবেশন করতে যায়। এ সফর উপলক্ষে “বাংলা নামের দেশ” নামে একটি পালা তৈরি করা হয়। যার সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সেন্টু রায়।  এ দলে ঢাকা, নেত্রকোনা, যশোর ও খুলনার শিল্পীরা অংশ নেন। তাঁরা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র স্টেডিয়াম,  বিশ্বভারতীতে এবং গাইঘাটায় গণসঙ্গীত পরিবেশন করে। পরের বছর আইপিসিএ এবং সলিল চৌধুরী, অন্তরা চৌধুরীকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁরা ঢাকাতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনসিটটিউটে, যশোরে তসবীর মহল হল এবং খুলনায় নাট্য নিকেতনে অনুষ্ঠান করেন।
উদীচী ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ২৮ মার্চ শিল্পীসংগ্রামী সত্যেন সেন-এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে সত্যেন সেন গণসঙ্গীত উৎসব ও জতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। ২০০৯ সালে ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে গণসঙ্গীত উৎসবের উদ্বোধন করেন গণশিল্পী অজিত রায় এবং প্রধান অতিথি ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী অজিত পাণ্ডে। উৎসবের আহবায়ক ছিলেন হাবিবুল আলম। ২০১০ সালে শিল্পকলা একাডেমীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে উৎসবের উদ্বোধন করেন সুধীন দাস এবং প্রধান অতিথি ছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। ২০১১ ও ২০১২ সালেও শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে গণসঙ্গীত উৎসবের আয়োজন করা হয়। ২০১১ সালে উৎসবের উদ্বোধন করেন সনজিদা খাতুন এবং অতিথি ছিলেন মৌসুমী ভৌমিক। ২০১০ এবং ২০১১ সালে উৎসবের আহবায়ক ছিলেন অমিত রঞ্জন দে। ২০১২ সালে উৎসবের উদ্বোধন করেন গণসঙ্গীত শিল্পী শরিফ শাহ দেওয়ান এবং এবারের উৎসবে কল্যান সেন বরাট ও তার দল কলকাতা কয়্যার অংশগ্রহন করে। উৎসবের আহবায়ক ছিলেন প্রবীর সরদার। এভাবেই গণসঙ্গীতকে স্বতন্ত্র একটি ধারা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে উদীচী একনিষ্ঠবাবে কাজ করে চলেছে।
খ. এদেশের প্রথম পথনাটক মঞ্চায়ন : উদীচী জন্মলগ্ন থেকেই মঞ্চনাটক করে আসছে। যেমন ১৯৬৮তে বাংলা একাডেমীতে মঞ্চনাটক “আলো আসছে”র মঞ্চায়ন হয়। কিন্তু পথনাটকের ক্ষেত্রে উদীচী এদেশে পথিকৃৎ। ১৯৬৯ এর ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদ স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে  উদীচী ঢাকা নগর ও শ্রমিক অঞ্চলে “শপথ নিলাম” নামে পথনাটক পরিবেশন করে। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই উল্কার বেগে নিউমার্কেট কাঁচাবাজার, সেকেণ্ড গেট, বিএমএ মাঠ, বায়তুল মোকাররম চত্বর, সদরঘাট টার্মিনালের পাশে, ধুপখোলা মাঠে, কমলাপুর রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, বাংলা একাডেমী বটমূলে, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে, বাওয়ানী ও আদমজী জুট মিল মাঠে এই পথনাটক মঞ্চস্থ হয় এবং গণঅভ্যূত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এর পরই জহির রায়হানের “পোস্টার” গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ অন্যান্য স্থানে  এ পথনাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়।
কেবলমাত্র ‘শপথ নিলাম’, ‘পোস্টার’ নাটক নয় দেশের প্রতিটি ঝড়-ঝঞ্ঝা-দৈব-দুর্বিপাকে, আন্দোলনে-সংগ্রামে সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে উদীচী। তাইতো ১৯৭০ সালের প্রবল ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লক্ষ লক্ষ সহায় সম্বল হারানো মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় উদীচী। দুর্গতদের সাহাযার্থে তৎকালীন স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার তেমন কোন কার্যক্রমই গ্রহণ করেনি। বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের সাথে উদীচী ত্রাণ কার্য্যে অংশগ্রহণ করে এবং সব হারানো মানুষগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তার ভিক্ষালব্ধ ত্রাণের ঝুলি নিয়ে। ৭১ এর জানুয়ারি (তথ্যসূত্র: সংবাদ) মাসে উদীচীর পূর্ব নির্ধারিত জাতীয় সম্মেলনে অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং তাদের জয় পরাজয় ইত্যাদি নিয়ে পরিবেশন করে নাটক জীবনতরঙ্গ। এ নাটকে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ এবং তার সহযোগী ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার করিম শাহাবুদ্দিন। এর পরের নাটক সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘প্রিয়তমাসু’।
গ. মহান মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে: ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা কালে যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, ঢাকাসহ সারা দেশ যখন উত্তাল মিছিল-মিটিং, স্লোগান, গণসঙ্গীতে সে সময়েও গানের পাশাপাশি উদীচীর নতুন পথনাটক ‘সামনে লড়াই’। কৃষক-শ্রমিক ভাইরা নিজেরাই চাঁদা তুলে এ নাটকের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন বিভিন্ন স্থানে। এ সময় উদীচীর আলাদা আলাদা কোন বিভাগ ছিল না। যে শিল্পীরা গান করতেন তারাই আবার নাটক করতেন। কেউ কেউ আবার আবৃত্তিও করতেন। এ সময় উদীচীর শিল্পীরা গান, নাটকের পাশাপাশি সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’ এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’ কবিতা দুটি বেশি বেশি আবৃত্তি করতেন। তারপর মহান মুক্তিযুদ্ধ। রাইফেল হাতে সরাসরি যুদ্ধে নামে উদীচীর শিল্পীকর্মীরা। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর। মুক্ত স্বদেশ। উদীচীর শিল্পী সৈনিকেরাও অস্ত্র জমা দিয়ে আবার হাতে তুলে নিল ঢোল, করতাল, হারমোনিয়াম, তবলা, নাটকের পাণ্ডুলিপি। এবার দেশ গাড়ার সংগ্রাম। সংগ্রামে শরীক আর সবার মত উদীচীর শিল্পীকর্মীরাও। ১৯৭২ এর একুশে ফেব্র“য়ারিতেই আবার পথনাটক ‘রক্তের ইতিহাস’ মঞ্চস্থ করে উদীচী। মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনার পাশাপাশি দেশ গড়ার সংগ্রামে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার আহবান জানানো হয় এ নাটকের মাধ্যমে। এই নাটকের মধ্যে দিয়ে উদীচীর শিল্পী কর্মীদের সাথে শ্রমিকদের সরাসরি সম্পর্ক গড়ে উঠে। শ্যামপুর থেকে বেশ ক’জন শ্রমিক উদীচীতে যাতায়াত শুরু করে এবং উদীচীর শিল্পীকর্মী হিসেবে সঙ্গীত ও নাটক বিভাগে যোগ দেয়। এই সময়ই উদীচী আর একটি পথনাটক পরিবেশন করে যার নাম ‘সাচচা মানুষ চাই। দেশ গড়তে মজুতদার, মুনাফখোরদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সাচচা মানুষের প্রয়োজনীয়তার কথা বিধৃত ছিল এই নাটকে।
ঘ. ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর সাহসী ভূমিকা : ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সমগ্র জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সারাদেশে বিরাজ করতে থাকে স্থবিরতা। রাজনৈতিক সামাজিক সকল কর্মকাণ্ড মুখথুবড়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ অতিবাহিত করতে থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত জীবন। কিন্তু পালিয়ে বাঁচতে জানে না উদীচীর শিল্পীকর্মীরা। অচিরেই সংগঠিত হয়। ’৭৫ এর আগস্ট থেকে ’৭৫ এর ডিসেম্বর। মাত্র ৫ মাস। সারাদেশ তখনো স্তব্ধ, মুক। কেউ কোন কথা বলে না। উদীচীর শিল্পীরা শিল্পকলা একাডেমীর অনুষ্ঠানে গান ধরেছে। সমবেত কন্ঠে, “এদেশ বিপন্ন, বিপন্ন আজ।” সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা থেকে শিল্পী অজিত রায়ের সুর করা গান। পরের গান সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে, “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা।” পরের গান ছিল “ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে”। এরপর ১৯৭৬ এর একুশের অনুষ্ঠান। সেন্টু রায়ের পরিকল্পনায় ৬ ফুট উচ্চতায় খালি মাইক্রোফোন, ডায়াসে পাইপ আর চশমা রেখে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ।
এর পরপরই মাহমুদ সেলিমের নেতৃত্বে রচিত হয় গীতিআলেখ্য ‘ইতিহাস কথা কও’। লোকজ ফর্মে ও সুরে এই গীতিআলেখ্যের ভিতর দিয়ে প্রচণ্ড সাহসের সাথে উদীচী বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধুর অবদান, তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ তুলে ধরে। এটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৭৬ এর ১৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের ইস্পাহানী কলেজের মাঠে। এর পরে ১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্র“য়ারিতে রমনা বটমূলে “ইতিহাস কথা কও” এর নির্ধারিত মঞ্চায়ন যখন নিষিদ্ধ হয় তখন সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রোকেয়া হলের সামনের রাস্তায় ১৫/২০ হাজার দর্শকের সামনে এটি মঞ্চায়িত হয়। তারপর সারাদেশের আনাচে কানাচে উদীচীর ২শতাধিক শাখার মাধ্যমে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করার জন্য ‘ইতিহাস কথা কও’-এর কয়েক সহস্রবার মঞ্চায়ণ হয়েছে।
১৯৭৮ সালের ২১ ফেব্র“য়ারিতে উদীচীর নাট্য কর্মীরা  মঞ্চে আনে ভাষা আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে রচিত নাটক ‘সাধের একতারা’। বলা হল একেবারেই সমসাময়িক রাজনীতি বর্জিত নাটক। যাতে সামরিক শাসনের দণ্ডমুণ্ডের চেলারা কোন কিছু খুঁজে না পায়। কিন্তু যারা দেখেছেন তারাই বলতে পারবেন সামরিক শাসনের মধ্যেও সে কী সাহসী প্রযোজনা। এ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হলো ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। এ সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান। দেশে হঠাৎ মূর্তি ভাঙ্গা শুরু হলো। তার প্রতিবাদে কাজী আকরাম হোসেনের পান্ডুলিপি নিয়ে উদীচী পরিবেশন করে একটি নৃত্যনাট্য।
ঙ. রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ গঠন ও বিস্তারে উদীচীর ভূমিকা : ১৯৭৮ এ বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী জাহিদুর রহিম এর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে গঠিত জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে ১৯৭৯ সালে সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। উদীচীর তৎকালীন সভাপতি কলিম শরাফী, সনজীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে এই কার্যক্রমের এক পর্যায়ে ১৯৮০ সনে বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এই পরিষদের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ”। শুরু থেকেই এর নেতৃত্বে ছিলেন উদীচী তৎকালীন সভাপতি কলিম শরাফী, ছায়ানটের সভাপতি সনজীদা খাতুন। সারাদেশে উদীচীর শাখাসমূহের সহায়তায় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ বিস্তৃতি লাভ করে এবং এর শাখাসমূহ গড়ে ওঠে। এখনও সারাদেশে উদীচীর নেতা-কর্মীবৃন্দই এই সংগঠনের মূল সহায়ক শক্তি।
চ. সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠন ও বিস্তারে উদীচীর ভূমিকা : ১৯৭৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সম্মিলিতভাবে একুশ উদযাপন কমিটি গঠনের আহবান জানিয়ে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করার অপরাধে উদীচীর তৎকালীন সভাপতি কলিম শরাফী তাঁর উচ্চপদের সরকারি চাকুরী হারান। তার দীর্ঘদিন পর ১৯৮২ সালে পুনরায় একুশ উদযাপন কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিতভাবে অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়। এ অনুষ্ঠানের মূল সংগঠক ছিলেন কবি, ছড়াকার ফয়েজ আহমদ, রামেন্দু মজুমদার, মফিদুল হক, উদীচীর মাহমুদ সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের মনজুর আলী ননতু প্রমুখ। পরবর্তীকালে একুশ উদযাপন কমিটিকেই ১৯৮৩ সালে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটে রূপান্তরিত করা হয়। এরপর দেশব্যাপী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনে উদীচীর জেলাসংসদ ও শাখাসমূহ প্রধান ভূমিকা পালন করে।
ছ. লোক সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশে ভূমিকা: স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম যখন তীব্রতর, নাগরিক সংস্কৃতির যখন জোয়ার চরছে সর্বত্র তখনও উদীচী গণসংস্কৃতি চর্চা থেকে দুরে সরে যায়নি। যতীন সরকার, খগেশ কিরণ তালুকদারদের অনুপ্রেরণায় ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমবারের মত তিনদিনব্যাপি আয়োজন করে লৈাক সঙঙ্গীত উৎসব। এ উৎসবে লোকশিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতী প্রথমবারের মত ঢাকার কোন মঞ্চে গান করেন। চট্টগ্রামের বিখ্যাত ঢোলবাদক বিনয়বাশী জলদাস প্রথমবারের মত ঢাকায় এসে ঢোল বাদন করেন। এবারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৬টি লোকসংস্কৃতি দল এ উৎসবে অংশগ্রহণ করে।’ ৯১ সালে এরশাদ শাহীর পতনের পর পরই জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয়বারের মত আয়োজিত হয় লোকসঙ্গীত উৎসব। লোকসঙ্গীত উৎসবে এবারে ঢাকার বারে থেকে নতুন করে যুক্ত হন সিলেটের শাহ আব্দুল করিম। এ উৎসবে উদীচীসহ  ৩০টি লোকসঙ্গীত দল অংশ নেয়। ’৯৩ সালে আবার আয়োজন করা লোকসঙ্গীত উৎসব। এবার ঢাকার বাইরে যশোরে আয়োজন করা হয় এ উৎসব। এরপর ১৯৯৭ সালে ইঞ্জিনিয়ারস ইনস্টিটিউটে আয়োজন করা হয় লোকসঙ্গীত উৎসবের। এ উৎসবের আহবায়ক ছিলেন সোহরাব উদ্দিন। সম্ভবত এ বারেই চট্টগ্রামে মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল মাঠে আয়োজন করা হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় লোকসঙ্গীত উৎসব। এ সব উৎসবে কখনো চট্টগ্রামের ফণীভূষণ বড়–য়া, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, ময়মনসিংহের আব্দুস সালাম বয়াতী, কুদ্দস বয়াতী, কুষ্টিয়ার আকবর আলী বয়াতী, খূলনা স্বপন হালদাররা অংশ নিয়েছেন। উদীচী এসব বিশিষ্ট শিল্পীদের ঢাকায এনে জাতীয় পর্যায়ে পরিচয় করিয়ে দেবার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। কেবলমাত্র জাতীয় পর্যায়ে নয় দেশের সীমানার বাইরেও তাদেরকে নিয়ে গেছে। বাংলা ১৩৯৯ সালে উদীচীর তৎকালীন সহসভাপতি তানভীর মোকাম্মেলের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের এশটি দল কলকাতায় যায়। সে দলে  লোকশিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতী ছিলেন। ১৪০০ সালে উদীচীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকে ২০০ জনের একটি দল কলকাতায় যান। যেদলে ছিলেন সাইদুর রহমান বয়াতী ও বিখ্যাত ঢোল বাদক বিনয়বাসী জলদাস। এ দলের দলনেতা ছিলেন রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা। বিনয়বাসী জরদাস তখন ৮০ বছরে উপনীত হয়েছেন। এ বয়সেই কলকাতা যাদুঘরে ঘন্টব্যাপি ঢোলবাদন করে কলকাতার উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করেছিলন।
জ. মে দিবস উদযাপন ও শ্রমিক শ্রেণীর সাথে সংহতি: গোটা পৃথিবীব্যাপি ১লা মে ‘মহান মে দিবস’ শ্রমিক শ্রেণীর উৎসবের, অধিকার আদায়ের দিবস হিসেবে পরিগণিত। এদিনে গোটা পৃথিবীর শ্রমিক অঞ্চলগুলো শ্রমিকের লাল পতাকায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকে। উদীচী বিশ্বাস করে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তিতে। তাইতো উদীচী’র শিল্পীকর্মীদের কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হয়ে উঠে ‘এই পতাকা শ্রমিকের রক্ত পতাকা…।’ প্রতি মে দিবসে ঢাকাসহ সারা দেশে অবস্থিত উদীচীর জেলা-শাখার শিল্পীকর্মীরা শ্রমজীবী মানুষের সাথে একাকার হয়ে যান। ঢাকাতে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাথে আদমজী, বাওয়ানী জুটমিলে প্রতি মে দিবসে এবং মাঝে মাঝেই উদীচীর কর্মীরা ছুটে যায়, শ্রমিকের সাথে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠে শ্রমিক অধিকারের গান। সায়েদাবাদ, পল্টন ময়দানে সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সাথে অনুষ্ঠান করেছে।  উদীচী মহান মে দিবসের ১০০ বছরফ’র্তিতে শিল্পি আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয প্রেসকÍাবের সামনে চিত্র প্রদর্শণীর আয়োজন করে। গত … সাল থেকে তেঁজগাও শিল্প এলাকায় গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাথে যৌথভাবে মে দিবস উদযাপন করছে। প্রথমবার জামসেদ আনোয়ার তপন উদীচীর পক্ষ থেকে আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এর পাশাপাশি ২০০৯  সাল থেকে মিরপুর অঞ্চলে প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে মে দিবস উদযাপন করে আসছে।  মিরপুর অঞ্চলে মে দিবস উদযাপন করার ক্ষেত্রে শুরু থেকে ইকবালুল হক খান নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
ঞ. স্বৈরাচারী এরশাদের পতনে ভূমিকা : ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত উদীচী একনাগাড়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গান ও পথনাটক রচনা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অনুষ্ঠান করে বেড়িয়েছে। গানগুলোর মধ্যে ছিল “নতুন বাংলাদেশ” এর প্যারডি “নতুন জংলি ড্রেস”, কথা কইলে হেয় চেইত্যা যায়, কুহুকুহু ডাক শুনিয়া, বড় গঙ্গে শাসনতন্ত্র, ‘ধামি মীরজাফর আলী, এসেি আধার রাতে, আমার ভাগার সময় হলো দাও বিদায় এবং আরও অনেক গান। এ সময় উদীচী যে নাটকগুলি পরিবেশন করে তার মধ্যে অন্যতম হইতে সাবধান, নরক গুলজার, আমার মাটি আমার ধান, মিছিল, দিন বদলের পালা, ধলা গেরামের নাম, রাজা রাজা খেলা। ‘রাজা রাজা খেলা’ নাটকটি পরিবেশিত হয় ’৮৭ সালে। এ নাটকটি যখন পরিবেশন করা হয় সারাদেশ তখন সামরিক শাসনের যাতাকলে পিষ্ট। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারী করে। তৈরি করে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা। সেসব উপেক্ষা করে স্বৈরশাসক এরশাদের শাসন প্রহসনের চিত্র তুলে ধরে সেন্টু রায় রচনা করেন নাটক “রাজা রাজা খেলা।” নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় শহীদ মিনারে। নাটকের পূর্বে উদীচী কার্যালয় থেকে একটি শোভযাত্রা করে শহীদ মিনারে যাওয়া হয়েছিল। এরপর ৮৯ তে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে নাটক ‘তেভাগার পালা’ পরিবেশন করা হয়। আবার এরশাদ, রওশান এরশাদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা দেশব্যাপী যে সমস্ত অপকর্ম করে চলেছিল এবং তার সাথে যে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ যুক্ত হয়েছিল সেটাকে তুলে ধরে সেন্টু রায়-এর রচনায় পরিবেশিত হয় নাটক ‘রাস্তায় বসে রাস্তার কথা’। উদীচী যেকোন আন্দোলন সংগ্রামে সরাসরি অংশ নিয়েছে। ’৮০’র দশকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, এ সময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আবৃত্তির দল গড়ে উঠতে থাকে। এরশাদ দু:শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এটটি নতুনমাত্রা যুক্ত হয় বৃন্দ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। তখনই ১৯৮৭-এর শেষের দিকে সৈয়দ শহীদ-এর পরিচালনায় উদীচীর আবৃত্তি বিভাগ গঠিত হয়। এসময়ে উল্লেখযোগ্য মঞ্চায়নের মধ্যে রয়েছে সত্যেন সেন-এর ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’। যার কাব্যনাট্যরূপ দিয়েছিলেন অনিমেষ আইচ। এরপরএরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তষনও উদীচি সাম্প্রদায়িকতা সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামকে অব্রাহত রেখেছে। ১৯৮৮ সালে এ ভূখণ্ডের মানুষের যে অসাম্প্রদাযিক ঐতিহ্য রয়েচে সে চেতনাকে লালন করে রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা গ্রন্থনা করেন সাম্প্রদাযিকতা বিরোধী কবিতা ও গান। যার মধ্যে খুলনা এস এম জাকারিয়ার ‘ কি আজগুবি কারবার, একাত্তরে ছিল যারা খুনি রাজাকার, আজকে তারা ধর্মের ব্যবসায় সাজেন পরহেজগার’, বড়– চণ্ডীদাসে, বল হে মানুষ ভাই,’, নজরুলের কাণ্ডারী হুশিয়ার প্রভৃতি কবিতা ও গান স্থান পায়্ এটি নির্দেশনায় ছিলেন সৈয়দ শহীদ এবং আবহ সঙ্গীত করেন সাবাব আলি আরজু। এটি সারাদেশে  ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যে এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামকে বেগবান করার লক্ষ্যে ক্যাসেট আকারে প্রকাশ করা হয়। তারপর ’৯১ সালে ওয়াহিদুল হকের এশটি ছোটগল্প ‘এক যে ছিল রাজপুত্তুর’  এর শ্র“তিনাটকে রূপান্তর ও  নির্দেশনা দেন বিপ্লববালা। যা প্রথম আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের উৎসবে প্রথম মঞ্চায়িত হয়। ১৯৯০ এর জনতার মঞ্চে উদীচীর ছিল সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬ এর ‘জনতার মঞ্চে’ও উদীচী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ট. সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও  অন্যান্য গণসংগ্রামে উদীচী: বাংলাদেশের সুচনালগ্ন থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সকল অর্জন ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এবং তা কেবলমাত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করা এবং পাস্তিানের পক্ষ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত হয়েে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জনসমূহ ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও। ১৯৭৪ সালে সরকারকে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় মূলত: নির্ভর করতে হয়েছিল আমেরিকান খাদ্য সাহায্যের উপর। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় পি. এল ৪৮০র অধীনে বাংলাদেশকে যেটুকু খাদ্য সাহায্য প্রদানের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল তা তারা সময়সূচী অনুযায়ি সরবরাহ না করে মিথ্যা অজুহাতে অত্যন্ত নাজুক দুইটি মাসে সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে তারা খাদ্যবাহী জাহাজগুলোর গতিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল দেশিয় এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ ও সমাজ বিরোধীরা। তারা নেমে পড়ে কালোবাজারী আর মজুতদারীতে, মেতে উঠে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার অসৎ প্রতিযোগিতায়। এ সময়ে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে বশ মানানো যাচ্ছিল না। স্বাধীনতার ভিত্তিমূলে আঘাত দেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে তীব্র সংকট যখন ঘনীভূত তখন উদীচীর নাট্যকর্মীরা রাস্তায় নামে ‘সাচ্চা মানুষ চাই’ নাটক নিয়ে। তারপরও শেষ রক্ষা করা যায়নি। স্বাধীনতা বিরোধী আর সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদদে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ড সংঘটিত করলো সেনাবাহিনীর কিছু কুলাঙ্গার। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো।
উদীচী বিশ্বাস করে আন্তর্জাতিকতাবাদে। সারাবিশ্বের নির্যাতিত মানুষের প্রতি তাঁর সংহতি জন্মের অঙ্গিকারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আফ্রিকার কালোমানুষের নেতা নেলসন মেন্ডেলার জেলাখানায় পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ‘কালো মানুষের প্রতি সংহতি’ জানিয়ে প্রকাশ করে জাতীয প্রেসক্লাবের সামনে উদীচী চত্বরে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ২০০১ সালে উদীচী নির্মাণ করে পথনাটক বায়োস্কোপ। সম্পদ পাচার, সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ ও বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার অসারতাকে ব্যঙ্গ এবং প্রতিবাদের সূত্র অনুসন্ধান ছিল এ নাটকের উপজীব্য। ২০০১ সালে উদীচী নির্মাণ করে মঞ্চনাটক “দ্য ফ্রিডম অব দা সিটি”। স্বনামখ্যাত আইরিশ নাট্যকার  ব্রায়ান ফ্রেইল এ নাটকের রচয়িতা। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির উপর যেমন ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও পশ্চিমের আধিপত্য, তেমনি আয়ারল্যাণ্ডের উপরও ছিল বৃটিশ শাসন ও শোষণ। সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক শঠতা ও অর্থনৈতিক অনাচার কোন কিছুতেই বাংলাদেশ থেকে স্বতন্ত্র নয় আয়ারল্যান্ড। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিকালের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা নাটকটির সাথে একাত্ম হয়ে আছে। এ নাটকের মাধ্যমে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিক আমলাতান্ত্রিক  ও মৌলবাদী  স্বৈরচরিত্রের সাথে উত্তর আয়ারল্যাণ্ডের সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, বৈসাদৃশ্য, তাদের চাওয়া-পাওয়া, সব কিছুর যে কি বিশাল দুরত্ব সেই রহস্যকে উন্মোচন করে এ নাটক।
চারদলীয় জোট ক্ষমতায় তাকা অবস্তায় আদমজীসহ দেশের বেশকিছু পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আদমজী বন্ধ ঘোষণা করার পর শহীদ মিনারে তিনদিনব্যাপি টানা কর্মসূচি পালন করেছে উদীচী। যেখানে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিশ্বব্যাংকের দায়মুক্তি বিল উত্তাপিত হলে তার বিরুদ্ধে রাজপথে মুখর থেকেছে উদীচী তার কবিতা, গান আর নাটক নিয়ে।
২০০৯ সালে সারাদেশ ব্যাপি যখন টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ ও সমুদ্র বক্ষে গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন চলছে, দেশপ্রেমিক, ম্ক্তুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ যখন প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে ঠিক সেরকম একটা মুহূর্তে (১০অক্টোবর ২০০৯) উদীচী রাজধানীর মুক্তাঙ্গনসহ সারাদেশে সংস্কৃতিকর্মী সমাবেশ ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এ অনুষ্ঠানে ‘গহনা’ নাটকের প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ নাটকের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসণের এক নিখাদ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন নাটকটির রচয়িতা মারুফ রহমান।
ঠ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন ও  সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রাম: উদীচী তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ। এ সংগ্রামে আরো গতিশীলতা তৈরি করার লক্ষে ১৯৮০ সালে মোস্তফা ওয়াহিদ খানের তত^বধানে ‘ইতিহাসকথা কও এবং আরো এশটি গুসঙ্গীতের ক্যাসেট প্রকাশ করে। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমী একুশের অনুষ্ঠানে মুকুন্দ দাসের গান করার জন্য উদীচী বরিশাল জেলা সংসদকে আমন্ত্রণ জানায়। বরিশাল উদীচীর পরিবেশনা থেকে অনেকের মধ্যেই মুকুন্দ দাসের গানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। থিয়েটার (বেইলিরোড) বরিশাল উদীচীর সাথে যৌথভাবে এশটি ক্রাসেট প্রকাশ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। গানের রেকর্ডিং হয় শ্র“তি স্টুডিওতে। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন পঞ্চানন ঘোষ এবং মূল সংগঠকের দাযিত্ব পালন করেন বদিউর রহমান। এরশাদ শাহীর পতনের পর কেবলমাত্র উদীচী নয়, গোটা জাতি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র প্রকাশ করে “একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়”। এই গ্রন্থটিকে মূল ধরে মোফাক্খারুল ইসলাম জাপানের রচনা ও নির্দেশনায় উদীচী মঞ্চস্থ করে পথনাটক ‘রাজাকারের পাঁচালী’। এই নাটকটি ১৯৯১ সালে উদীচী নির্মাণ করে। ১৯৯১ সালে উদীচী আরো নির্মাণ করে ‘ইঁদুরের কিস্সা’। আমরা এক ধরনের ইঁদুরকে চিনি, যারা প্রতিনিয়ত ধবংস করছে সম্পদ। কিন্তু আমাদের সমাজে আরো অনেক ধরনের ইঁদুর রয়েছে। যারা আমাদের মূল্যবোধ ধবংস করছে, সমাজটাকে খেয়ে ফেলছে। এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ জয় করেছে বারে বারে। কিন্তু এই ইঁদুর শ্রেণীর সমাজ নেতাদের কারণে সে জয়ের কোন হিসেব নেই। এদেরকে চিহ্নিত করা এবং ধরার আহবান জানিয়ে রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা রচনা করেন নাটক ‘ইঁদুরের কিস্সা’। নির্দেশনা দেন সাবাব আলী আরজু।
যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এলাকার মানুষ বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে তাকে ডাকে স্মৃতি সৌধে পুষ্পার্ঘ অর্পন করার জন্য। এর বাইরে আর কেউ তার খবর রাখে না। একজন মুক্তিযোদ্ধা যিনি বাস ড্রাইভার ছিলেন। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন। ১৯৯১ সালে এরকম একজন মুক্তিযোদ্ধার দুর্বিসহ জীবনের কাহিনী নিয়ে ‘একজন গনি মিয়ার সংবাদ’ নামে একটি নাটক রচনা ও নির্দেশনা দেন রতন সিদ্দিকী। এরপর উদীচী মঞ্চে আনে সত্যেন সেন-এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘অভিশপ্ত নগরী’র নাট্যরূপ। যে নাটকের মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি ও সাম্প্রদায়িক কূপমণ্ডুকতায় একটি জাতি কিভাবে ধ্বংস হয়ে যায় এবং অন্যরা সেখানে এসে জায়গা করে নেয় এবং তা কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বন্দ্ব-সাম্প্রদায়িকতা থেকে জাতিকে বের করে আনার সর্বজনীন লক্ষ্যকে সামনে রেখে উদীচী সত্যেন সেন এর এই বিখ্যাত উপন্যাস অভিশপ্ত নগরী’র নাট্যরূপ মঞ্চে আনে।
আমাদের ইতিহাস তৈরির যেমন ঐতিহ্য রয়েছে তেমন রয়েছে ইতিহাস বিকৃতির নোংরা স্বভাব। একশ্রেণীর মানুষ সর্বদা এ ধরনের ঘৃণ্য অপকর্মের সাথে লিপ্ত থেকেছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ এর পর থেকে স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তি ক্ষমতায় থাকার কারণে স্বাধীনতার সত্যিকারের ইতিহাস বিকৃত করে ভ্রান্ত ইতিহাস তরুণ সমাজকে শেখানো হচ্ছিল। ১৯৯০ এর পর এই বিকৃতি চরমে পৌঁছে। ১৯৯৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শুরু হয়েছিল নানা চক্রান্ত। তাঁকে নিয়ে রীতিমত শুরু হয়ে গিয়েছিল নোংরা রাজনীতি ও নানা ধরনের বিতর্ক। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করা শুরু হয়েছিল। এমন সময় উদীচী কেন্দ্রীয় নাটক বিভাগ রাস্তায় নামে ব্যঙ্গাত্মক নাটক ‘ঈশ্বরের আদালত’ নিয়ে। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা ছিলেন মোফাক্খারুল ইসলাম জাপান। প্রথম মঞ্চায়ন হয় জাতীয় শহীদ মিনারে।
ইতিহাস বিকৃতির এই নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং সমগ্র দেশব্যাপী শিশু কিশোরদেরকে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস পাঠ করানোর মানসে ১৯৯৪ তে উদীচী গঠন করে “স্বাধীনতার ইতিহাস প্রতিযোগিতা পরিষদ”। এর অধীনে ১৯৯৫ এর মে মাসে সারাদেশের ১৩৫টি থানায় অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণীর ৪৫,০০০ ছাত্রছাত্রী উদীচী প্রকাশিত ড. মোহাম্মদ হাননান রচিত “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: কিশোর ইতিহাস” বইটি নামমাত্র মূল্যে কিনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সারা দেশের থানা পর্যায়ে মেধাক্রম অনুযায়ী প্রতি শ্রেণীর দশজন করে ছাত্রছাত্রীকে পুরস্কৃত করা হয়। সকল থানার প্রথমস্থান অধিকারীকে ঢাকায় এনে পুরস্কৃত করা হয়। এতে শিশু কিশোরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পঠনে বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি হয়। এর মাঝে ’৯২ তে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য বেলায়েত হোসেনের দায়েত্বে উদীচী আবৃত্তি বিভাগ পরিবেশন করে ‘প্রেসনোট’। তারপর সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গী, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি ও নগরের নানা অসামাঞ্চস্যের উপর রচনা ‘নগর তিলোত্তমার কথাকতা’ পরিবেশিত হয়।
উদীচীর এ কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারেনি স্বাধীনতা বিরোধীরা। আর তাই ১৯৯৯ সালে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলা করে কেড়ে নিয়েছে দশটি তাজা প্রাণ। ক্ষতবিক্ষত করেছে দুই শতাধিক মানুষকে। ২০০৫ সালে আবার নেত্রকোনায় উদীচী অফিসের সামনে বোমা হামলা করে কেড়ে নিয়েছে হায়দার-শেলীকে। কিন্তু থামাতে পারেনি উদীচীর কর্মকাণ্ড। বরং যশোরের বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে ১৯৯৯ সালেই মঞ্চস্থ করা হয়েছে নাটক ‘পুনরুত্থান’। উদীচী স্বাধীন দেশে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বরূপ উন্মোচন করে পরিবেশন করে নাটক বর্ণচোরা, স্বাধীনতার সংগ্রাম, তাতাল, পূর্ণিমা প্রভৃতি নাটক। ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সারাদেশব্যাপী সংগঠিত সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের যারা শিকার হয়েছিল পূর্ণিমা তাদের অন্যতম। পূর্ণিমা লাঞ্ছনার পূর্বাপর ঘটনা নিয়ে প্রবীর সরদার রচনা করেন ‘পূর্ণিমা’। ২০০৫ সালে নাটকটি উপস্থাপন করে উদীচী। মঞ্চস্থ করে মমতাজউদ্দিন আহমদের ক্ষতবিক্ষত।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে উদীচীর সংগ্রাম সঙ্গীত, নাটক, আবৃত্তি ও চিত্রকলার পাশাপাশি সমাবেশ ও মিছিলেও সমান গতি সঞ্চার করেছে। উদীচীর উদ্যোগে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ‘৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গঠন করা হয়েছে বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটি। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামের অংশ হিসেবে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য ত্বরান্বিত করার দাবীতে সারাদেশে সপ্তাহব্যাপী (১২-১৮) কর্মসূচি পালিত হয়। এরপর ৫ জানুয়ারি কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা করলে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চসহ সারাদেশে যে অগ্নিস্ফুরণ ঘটে উদীচী তার অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। উদীচীর শিল্পীকর্মীরা প্রথমদিন থেকে সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নাটক নিয়ে মুখর  থেকেছে। বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে আবৃত্তি বিভাগ পরিবেশন করেছে হেলাল হাফিজের ‘অস্ত্র সমার্পন’, রুদ্র মোহাম্মদ শহদিুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’, সলিল চৌধুরীরর ‘শপথ’ কবিতার প্যারোডি পরিবেশন করা হয়। নাটক বিভাগ রবিউল ইসলাম শশীর নির্দেশনায় পরিবেশন করে একটি ব্যঙ্গ নাটক ‘ইহা একটি নাটক’। আর সঙ্গীত বিভাগ পরিবেশন করে অগ্নিঝরা ‘গণসঙ্গীত’। এ সময় উদীচীর শিল্পীকর্মীরা রচনা করেছেন অজস্র গান ও কবিতা।
উদীচীর পয়তাল্লিশ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাস নানা চড়াই-উৎরাই, বাধাবিপত্তি, আনন্দ বেদনার ইতিহাস। কিন্তু উদীচীর পথচলা কখনও থেমে থাকেনি। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে অদ্যাবধি বাঙালির সকল গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে অনবদ্য ভূমিকা পালন এবং অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল জাতি গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে। জাতীয় পর্যায়ে এ অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ উদীচীকে এবার প্রদান করা হয়েছে ‘একুশে পদক ২০১৩’।