উদীচীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহবান

সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ- এই দুইয়ের বিরুদ্ধেই একইসাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চলছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত তিন দিনব্যাপী জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন সকালে “দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম” বিষয়ক সেমিনারে এ মত তুলে ধরেন তারা।

জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন ২০১৫ এর সেমিনার
জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন ২০১৫ এর সেমিনারের উপস্থিতি

cropped-IMG_4512.jpgশিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান। উদীচীর কেন্দ্রীয় সভাপতি কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শফিউদ্দিন আহমেদ, সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, প্রগতি লেখক সংঘের কার্যকরী সভাপতি কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু, উদীচীর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. চন্দন দাস এবং উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য ডা. রফিকুল হাসান জিন্নাহ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, সাম্প্রদায়িকতা ও সা¤্রাজ্যবাদ উভয়ই বিশ্ব মানবতার শত্র“। বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব কখনোই মৌলিক দ্বন্দ্ব হতে পারেনা। শ্রেণি দ্বন্দ্বই সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্ব। সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব, ভাষাগত, জাতিগত, আঞ্চলিক ইত্যাদি দ্বন্দ্ব হলো অবৈরি দ্বন্দ্ব। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেশীয় শাসকেরা এবং ঔপনিবেশিক তথা সাম্রাজ্যবাদীরা এগুলোকে বৈরি দ্বন্দ্বে পরিণত করে মানুষের বিকাশের ক্ষেত্রে বাধার প্রাচীর তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মৌলবাদীদের সাথে পাকিস্তানের মৌলবাদীদের আত্মিক ও বৈষয়িক সম্পর্ক দৃঢ় হচ্ছে মন্তব্য করে তারা আরো বলেন, ভারতের হিন্দু মৌলবাদের নানা তাণ্ডব বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুসলিম মৌলবাদকে নানাভাবে শক্তি জোগান দিচ্ছে। তেমনি মিয়ানমারের বৌদ্ধ মৌলবাদীদের উগ্র সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডে শক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদীরা। ভারতে মৌলবাদীদের মসজিদ ভাঙা, বাংলাদেশে মন্দির ভাঙা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযানের মধ্যে মৌলিক গুণগত পার্থক্য নেই। এসব কাজ ঘৃণার্হ বলে অভিহিত করেন বক্তারা। একইসাথে এরকম সব ঘৃণার্হ সাম্প্রদায়িতাবাদ ও মৌলবাদকে সমূলে উৎখাত করার জন্য সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য আজ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তারা। বক্তারা আরো বলেন, সংস্কৃতির দুর্দিন রাজনীতির দুর্দিনের চেয়েও ভয়াবহ। সভাপতির বক্তব্যে উদীচীর কেন্দ্রীয় সভাপতি কামাল লোহানী বলেন, বর্তমানে শ্রেণী দ্বন্দ্বের বিষয়টি সবার সামনে চলে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘুর অনুপাত শতকরা ৩৪ ভাগ হলেও বতর্মানে তা ৮ শতাংশে নেমে এসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংস্কৃতির বিনিময় এবং সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণী দ্বন্দ্বের বিরুদ্ধে লড়াই করার লক্ষ্যে উদীচী দক্ষিণ এশিয়ায় একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়।

সেমিনার শেষে মধ্যাহ্ন বিরতির পর শুরু হয় দিনের অনুষ্ঠানমালার দ্বিতীয় পর্ব। বিকাল চারটা থেকে শুরু হওয়া এ পর্বে গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হন দেশব্যাপী উদীচীর বিভিন্ন জেলা ও শাখা থেকে আগত শিল্পী-কর্মীরা। ফরিদপুর জেলা সংসদের গণসঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের অনুষ্ঠানমালা। এরপর গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া শাখার শিল্পীরা। এরপর হাওড় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল গান নিয়ে মঞ্চে আসেন সুনামগঞ্জ জেলার শিল্পীরা। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম, বৈষ্ণব সাধক রাধারমণ দত্তসহ বিভিন্ন লোকশিল্পীদের গান দিয়ে উৎ]সব প্রাঙ্গণ মাতিয়ে রাখেন তারা। এসময় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা নাচে মেতে ওঠেন। এরপর গীতিনাট্য পরিবেশন করেন বরিশাল উদীচীর শিল্পীরা। এছাড়াও, ছিল চট্টগ্রাম, যশোর, ঝিনাইদহ, ফেনী, নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শাখার উদীচীর শিল্পী-কর্মীরা। তারা পরিবেশন করেন গান, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ উপস্থাপনা। উদীচীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনের তৃতীয় ও শেষ দিন ১৯ ডিসেম্বর বিকেল থেকেও থাকবে গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা।

লাখো শহীদের রক্ত ঋণ শোধ করার আহবান জানিয়ে ১৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে তিনটায় শুরু হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত তিন দিনব্যাপী জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে “শহীদ স্মরণে আপন মরণে, রক্ত ঋণ শোধ কর, শোধ কর”- এই শ্লোগানকে ধারণ করে আয়োজিত সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রখ্যাত লোকশিল্পী আমান উল্লাহ গায়েন। অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের স্রষ্টা নিভৃতচারী আমান উল্লাহ গায়েনকে উদ্বোধক হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলার আবহমান সংস্কৃতিকে সবার সামনে নতুন করে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছে উদীচী। লোকশিল্পী আমান উল্লাহ গায়েন ছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক শান্তনু কায়সার এবং সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তির নৃশংস হামলায় নিহত গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম কর্মী রাজীব হায়দার শোভন-এর বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার। আর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সম্মেলন প্রস্তুতি পরিষদের আহবায়ক শংকর সাওজাল। উদ্বোধনী পর্বে বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের বিকল্প নেই। দেশের আবহমান সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং এর প্রতি নতুন প্রজন্মকে উদ্বুব্ধ করার মাধ্যমেই সত্যিকারের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের আত্মত্যাগ ও মা-বোনদের সম্ভ্রমহানির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়াসকে সামনে রেখে উদীচীর এবারের সাংস্কৃতিক সম্মেলনের শ্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্নের সাথে প্রতি মূহুর্তে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে। যে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন বাংলার আপামর জনগণ দেখেছিলেন তা পূরণের থেকে এখনও অনেকটাই দূরে রয়েছি আমরা। বারবার সংবিধানকে কাঁটাছেঁড়া করার মাধ্যমে বারবারই ভূলুষ্ঠিত করা হয়েছে ৭২’র সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে। তাই, শহীদদের কাক্সিক্ষত স্বদেশের জন্য আজ আবারো লড়াই করার সময় এসেছে। লাখো শহীদের রক্তের যে ঋণ মাথায় নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু তা পরিশোধ করার সবচাইতে উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে তাদের স্বপ্নকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ সংবিধানের চার মূলনীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। আর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সে লক্ষ্যেই সাংস্কৃতিক লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে উদীচী। তাদের ত্যাগের প্রতি যে বিশ্বাস, তাকে প্রমাণ করার জন্য আমাদেরকে কাজ করতে হবে। যত বাধাবিপত্তি আসুক না কেন, শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও তাদের রক্ত ঋণ শোধ করতে প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে।

Leave a Reply