Categories
সংবাদ

উদীচী’র উনবিংশ জাতীয় সম্মেলন শুরু

এ সমাজ ভাঙিতেই হইবেঃ উদীচী’র ঊনবিংশ জাতীয় সম্মেলনে জসিম মণ্ডল

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা ধনী-গরীবের বৈষম্যকে দূর না করে বরং তা জিইয়ে রাখতে চায়, তাই এ সমাজ ভাঙতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক আন্দোলনের প্রবাদ প্রতিম পুরুষ জসিম উদ্দিন মণ্ডল। লড়াই, সংগ্রাম ও গণসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক-বাহক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ঊনবিংশ জাতীয় সম্মেলনে সম্মাননা পাওয়ার পর দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আর গান, নাচ, নাটকের মাধ্যমে এ লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে উদীচী। তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে তাদের কাছে সাম্যবাদ, মুক্তির বার্তা শোনানোর জন্য তিনি উদীচীর শিল্পী-কর্মীদের প্রতি আহবান জানান।

“নিত্য বাজুক বজ্রবীণা, মানুষ জাগুক জয়ে”- এই শ্লোগান নিয়ে ২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে উদ্বোধন করা হয় উদীচীর ঊনবিংশ জাতীয় সম্মেলন। দ্বি-বার্ষিক এ সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে অতিথিদের উত্তরীয় ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতিরা।

শহীদ বেদীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উদীচীর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এরপর জাতীয় সঙ্গীতের সাথে জাতীয় পতাকা ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় সঙ্গীতের পর সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ে মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নৃশংস বোমা হামলায় নিহত উদীচীর নেতা খাজা হায়দার হোসেন ও সুদীপ্তা পাল শেলীর পরিবারের সদস্য এবং ওই ঘটনায় আহত সহযোদ্ধাদের পক্ষে তুষার কান্তি রায়। এসময় সুদীপ্তা পাল শেলীর মা অরুনা রানী পাল, খাজা হায়দার হোসেনের স্ত্রী শাহনাজ বেগম এবং বোমা হামলায় আহত মাসুদুর রহমান খান, সুসহ বণিক মলু ও সুব্রত রায় টিটু উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন ঘোষণার সাথেসাথেই একদল চৌকষ ঢাকীর ঢাক বাদন ও তার সাথে নৃত্যের তালে তালে উল্লাসে মাতোয়ারা হন শহীদ মিনার চত্বরে উপস্থিত বিভিন্ন জেলা ও শাখা থেকে আগত উদীচীর প্রায় দু’হাজার শিল্পী-কর্মী। ঢাক বাদন ও নৃত্যের পর শুরু হয় উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের পরিবেশনায় গীতি আলেখ্য- “মানুষ জাগুক জয়ে”। এটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন।

উদ্বোধনী পর্ব শেষে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শহীদ মিনার থেকে বেরিয়ে দোয়েল চত্বর, টিএসসি মোড় প্রদক্ষিণ শেষে পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে শুরু হয় উদ্বোধনী আলোচনা সভা। উদীচীর কেন্দ্রীয় সভাপতি কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে এ পর্বের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার। এতে অংশ নেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, সাহিত্যিক জাকির তালুকদার, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও শ্লোগানকন্যা লাকি আক্তার। এসময় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্র্রাম, স্বাধিকার আদায়ের লড়াইসহ প্রতিটি মুক্তিকামী সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এবং কখনো কখনো অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখিয়েছে উদীচী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের স্বার্থেই উদীচীর টিকে থাকা এবং এর উত্তরোত্তর আয়তন বৃদ্ধি করা জরুরী বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা। আলোচনা সভার মধ্যেই সম্মাননা দেয়া হয় শ্রমিক আন্দোলনের প্রবাদ প্রতিম পুরুষ জসিম উদ্দিন মণ্ডলকে। উদীচীর পক্ষ থেকে জসিম উদ্দিন মণ্ডলের হাতে তাম্রলিপি তুলে দেন উদীচীর সভাপতি কামাল লোহানী। আর, তাঁকে উত্তরীয় পড়িয়ে দেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার।

আলোচনা সভা শেষে মধ্যাহ্ন বিরতির পর শুরু হয় সম্মেলনের সাংগঠনিক পর্ব, কাউন্সিল অধিবেশন। এ অধিবেশনটি উদীচীর তিন শতাধিক শাখা থেকে আগত প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এরপর সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্ব। এ পর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক সংস্কৃতির পরিচায়ক নানা আঙ্গিকের পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন উদীচীর বরিশাল বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের শিল্পীরা। এছাড়াও ছিল উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের দলীয় সঙ্গীত পরিবেশনা, অনিক বসুর পরিচালনায় ‘স্পন্দন’-এর দলীয় নৃত্য এবং বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ও বেলায়েত হোসেনের একক আবৃত্তি।

দু’দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২৭ ডিসেম্বর শনিবার, সকাল ১০টায় শুরু হবে সম্মেলনের সাংগঠনিক পর্ব কাউন্সিল অধিবেশন, যা শুধুমাত্র প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। দিনব্যাপী নানা সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষে আগামী দু’বছরের জন্য নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন এবং তার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ পর্বটি। এরপর সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু হবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্ব। এদিন আবহমান বাংলার চিরায়ত লোক সংস্কৃতির নানা পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হবেন উদীচীর সিলেট বিভাগ, খুলনা বিভাগ এবং রংপুর বিভাগের শিল্পীরা। এছাড়াও, থাকবে সোহানা আহমেদের একক সঙ্গীত ও শাহাদাৎ হোসেন নিপুর একক আবৃত্তি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.