Categories
প্রবন্ধ

আমার শিশু মনের তিন কবি: কাজী মোহাম্মদ শীশ

এই পরিণত বয়সেও সুকান্ত-নজরুল-রবীন্দ্রনাথ এই তিন কবিকে নিয়ে যখনই নাড়াচাড়া করি তখনই আমার শিশু মনে গেঁথে থাকা কিছু শব্দ, কিছু কথা, কিছু ছন্দ, কিছু তরঙ্গ নিরন্তর বহে চলে অন্তর জুড়ে। আমার অনুভূতিতে তোলে এমন সব ঢেউ যা ভাষায় রূপ দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। কেমন করে কোথা থেকে শুর করবো বুঝে উঠতে পারি না। খুঁজতে চেষ্টা করি শিশু কালের সেই সময়টাকে। কখনো মনে হয় খুঁজে পেয়েছি। কখনো মনে হয় সব কিছু থেকে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পারিবারিক কারণে কিনা জানি না পারিপার্শ্বিক প্রভাবে হয়তো বা, নতুবা তখনকার আর্থসামাজিক অবস্থা, পাড়া মহল্লার সংবদ্ধতা সবটা মিলিয়ে আরো অনেকের মতো আমাকেও বিশেষ কিছু পড়াশোনা করার আগেই এই তিন কবির সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিল। তিনজনই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল আমার শিশু মনে। দিনে দিনে এই কবির সাথে আমার বন্ধুত্বকে প্রগাঢ় করে তুলেছিল আরও কিছু কবি-গীতিকার-নাট্যকার-গায়কের কবিতা গান-নাটক। সে সব গান-কবিতা-নাটক আমার রক্তের সাথে মিশে গিয়ে মন জগতে কী এক বিস্ময়কর অনির্বচনীয় আনন্দধারা সৃষ্টি করে চলেছে অবিরত। বড় ইচ্ছে করে ছেলেবেলার সেই ছেলেমানুষির কিছুটা ভাগ বর্তমান শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। ভাবি আমার সেই ছেলেবেলা যদি বার বার ফিরে আসতো প্রথমে মনে পড়ে গানের কথা। তখনও স্কুলে যাওয়া শুর হয় নাই। ছাপার অক্ষরে পড়ার অনেক আগেই পিন লাগানো দম দেওয়া গ্রামোফোন যন্ত্রে
‘রানার রানার’ গানটি শুনে ডাক হরকরার কঠিন-করুণ জীবনের ছবি শিশু মনে গভীর রেখাপাত করে। তখন কিন্তু এ গানের পরই আর একটি রেকর্ড অবশ্যই শুনতে হয়েছে। শুনতে হয়েছে কোন এক গাঁয়ের বধূর সরল-সুন্দর-সুখী জীবনের করুণ সমাপ্তির কথা কোন এক গাঁয়ের বধূর গানটি। কেন সুকান্তের পর সলিল চৌধুরীর গান অপরিহার্যভাবে শোনার বাসনা জেগেছে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজন হয় নাই। কোথায় কীভাবে রানার গানের শেষ অংশ;

রানার! রানার! ভোর তো হয়েছে-আকাশ হয়েছে লাল
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার! গ্রামের রানার!
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;

এর সাথে গাঁয়ের বধূর গানের শেষ লাইন। আজ যদি তুমি কোন গাঁয়ে দেখো ভাংগা কুঠিরের সারি জেনো সে গাঁয়ের বধূর আশা স্বপনের সমাধি। আমার শিশু মনকে কেন একই ভাবে দোলা দিয়েছিল তা আজও বুঝতে পারি না। অনুরূপভাবে কৃষ্ণকলির ‘আলোর ধারে একা দাঁড়িয়ে’ থাকা অথবা ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথে’র সাথে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা ‘পালকি চলে হুনহুনা’-একই অনুভূতি সৃষ্টি করতো বা এখনও করে-আমার কাছে তা এক বিস্ময়। এমন আরও অনেক অনেক মিলের মিলন আমার কচি মনকে আবেগে আবিষ্ট করে রাখতো। সেই ছোট বয়সে তখনও কবিতা পড়া শুরু করা হয় নি। ছড়া নিয়ে খেলা চলছে। তবে কবিতা শোনার কারণটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাসায় আব্বা কবিতা পড়ে শোনাতেন। দেশের বাড়ী রংপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় অথবা ঢাকা শহরের গোপীবাগ এলাকায় বসবাস কালে খোলা জায়গায় স্টেজ বানিয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। সে সব অনুষ্ঠানে প্রায়শ সুকান্ত ভট্টাচার্য, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান-কবিতা আবৃতি করা হতো। সেখানে কেউ কাজী নজরুল ইসলমের কবিতা আবৃতি করছেন :

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।-

অথবা কোন কিশোর আবৃত্তি করছে :

দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

কিংবা পাড়ার কোন তেজস্বিনী বিদ্রোহী নারী হয়ে উঠেছেন :

মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও-শিকল!
যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

আবার মন্ত্রমুগ্ধের মতো সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা শুনেছি :

প্রাণপণে পৃথিবীর সবার জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

এ ওই মুগ্ধতা কাটতে না কাটতে এক অজানা অনুভূতিতে মন আবিষ্ট হয়েছেÑ চোখে পানি এসেছে যখন শুনেছি :
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গণ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!
প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময় :
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি ॥

আবার কবিতার মধ্য দিয়ে দূর বিদেশের পথে দস্যুদের কবল থেকে ছোট্ট খোকার মাকে রক্ষা করার গল্প শোনার সময় চোখের পাতা পড়েনি। মাকে রক্ষা করার জন্য খোলা তলোয়ার হাতে খোকা এগিয়ে যাচ্ছে। খোকার নিরাপত্তা নিয়ে মা উদ্বিগ্ন। খোকা বলছে :

তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে!’
আমি বলি, ‘দেখো-না চুপ করে।
ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
ঢাল তলোয়ার ঝন্ঝনিয়ে বাজে,
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।’

যতই শুনি ততই মনে হয় আমিই তো সেই ‘বীরপুরুষ’ শিশু। এভাবে কবিতা শোনায় অভ্যস্ত হতে হতে এক সময় এমন কিছু কবিতার লাইনের দেখা পেলাম অর্থ হয়তো তেমন বুঝি নাÑকিন্তু মনের মধ্যে গেঁথে গেছে চিরকালের জন্য অন্য আর এক অনুভূতি নিয়ে। সে সব কবিতা কখনো দুঃখ সহ্য করার সঙ্গী হয়ে উঠেছে। কখনো বা চিত্তকে আনন্দে আপ্লুত করে তুলেছে। আবার কখনো সাহসী মানুষে পরিণত করেছে। বিবেক জাগ্রত হয়েছে বিশ্বকবির বানীতে :

এই-সব মূঢ় স্লান মূক মুখে
দিতে হবে ভাষা! এই-সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে
‘মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে;
যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা-চেয়ে,
যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে।

এভাবে আবৃত্তিকারের নাম বলার মধ্য দিয়ে অথবা আব্বার কাছে নানা কবিতা শোনার মধ্য দিয়ে কবি সুকান্ত-নজরুল-রবীন্দ্রনাথ আমার শিশু মনে কি এক শিহরণ জাগিয়ে তুলতো! অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর কয়েকদিন পর্যন্ত নানা গান-কবিতার রনরন শব্দ কানে বেজে থাকতো। এভাবেই তিন কবি আমার জীবনের সাথে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে শিশু কাল থেকে।
কিন্তু যখন বয়স বাড়লো, তখন প্রতিবেশ-পরিবেশ এবং আমার বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেকেই আমার পরম আত্মীয় তিন কবিকে আমার মন জগত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল। ঠিক দূরে নয়Ñকেমন যেন অনাত্মীয়তে পরিণত করতে চাইল।
নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা হলো ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কবিতো তোমার পরম আত্মীয় হতে পারে না। কবি হিসেবে তাদের মধ্যে কে বড় কে ছোট সে প্রশ্ন তোলা হলো। তাদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য না থাকলে, একই বয়স পর্যন্ত তারা বেঁচে থাকলে দেখা যেতো কে বড় কবি হতো। প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে দুই ধর্মের কবির পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে। সেখানে নাকি ঈর্ষার গন্ধ পেয়েছেন অনেকেই। অনাবিল আনন্দের মধ্যে আমাদের শিশু মনে গড়ে ওঠা সহজ-সরল চিন্তা-চেতনা ও উপলব্ধিকে তছনছ করে দেওয়ার জন্যই কী এসব প্রশ্নের অবতারণা! পরিণত বয়সে সংকীর্ণ চিন্তার এসব অবান্তর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জীবনের সুন্দর সময়ের অপচয় করতে হচ্ছে আমাদের। অথচ কিশোর বয়সে যখন জেনেছি কবি সুকান্ত মাত্র ২১ বছর (১৫ আগস্ট ১৯২৬-১৩ মে, ১৯৪৮) বয়সে মারা গেছেন তখন চোখে পানি এসে গেছে, মনে হয়েছে আরও কত কত সুন্দর কবিতা, অমর সব রচনা করতে পারতেন যদি তাঁর আয়ু দীর্ঘ হতো। তবে যেসব লেখা তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন তার মধ্যেই ডুবে থাকতে মন চেয়েছে। তারপর আমরা জেনেছি তাঁর কালের সবচেয়ে বড় ইংরেজ রোমান্টিক কবি শেলি মাত্র ৩০ বছর (৪ আগস্ট ১৭৯২,-৮জুলাই, ১৮২২) বয়সে সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ডুবিতে মারা যান। আরও জেনেছি সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টা মোৎসার্ট রিউমেটিক ফিভারে ভুগে মাত্র ৩৫ বছর (২৭ জানুয়ারী, ১৭৫৬, ১৭৯১) বয়সে মারা যান। এমন সব অকাল মৃত্যু এই বিশ্বকে অনেক অনেক কিছু পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে। তবে আমাদের সহজ-সরল-সুন্দর উপলব্ধি হল মানুষের জীবনের দীর্ঘতা অবশ্যই কাম্য। একই সাথে স্বল্প আয়ুর মানুষও জীবনের বিরাটত্বকে নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারেন। সুকান্ত-শেলি-মোৎসার্ট সেই বিরাটত্বকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন।
রবীন্দ্র-নজরুলের জীবন দর্শন ও পরস্পর সম্পর্ক নিয়ে এক সময় এল অবাক করা সব অলীক প্রশ্ন। অথচ সেই শৈশব থেকে জেনে এসেছি ১৯২২ সালে ২২/২৩ বছরের কাজী নজরুল ইসলাম এক বিপ্লবী উদ্যম নিয়ে অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। ষাটোর্দ্ধ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন কেবল বিশ্ব কবি নন-বিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল মনীষী। ধূমকেতু পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাণী শীর্ষে ধারণ করে প্রকাশিত হত :

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,
আয় চলে আয় রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের দে তোর বিজয় কেতন
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে,
আছে যারা অধচেতন।
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৯৫২ সালে নজরুল সাপ্তাহিক লাঙ্গল পত্রিকা প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশীর্বচন লেখেন

ধর, হাল বলরাম,
আন তব মরু-ভাঙা হল
বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।

একইভাবে কাজী নজরুল ইসলাম শৈশব থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। নজরুল তা এভাবে প্রকাশ করেছেন, ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে।…ছেলেবেলা থেকে তার ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ, ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোক ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে।’ নজরুলের উপস্থিতিতে একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কথাশিল্পী মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায় নজরুলের এই ভক্তি-শ্রদ্ধার কথা জানালেন। নজরুল ইসলাম সসংকোচে দূরে গিয়ে বসেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে কাছে ডেকে হেসে বলেন, ‘যাক্ আমার আর ভয় নেই তাহলে।’ রবীন্দ্রনাথের সøেহে কাছে টেনে নেয়া নজরুলকে অভিভূত করতো। তিনি লিখেছেন, “তখন আমার মনে হতো আমার পূজা সার্থক হল, আমি বর পেলাম।”
কবি গুরুর তরফ থেকে নজরুলের কবি প্রতিভার স্বীকৃতি এবং রবীন্দ্র-নজরুলের পরস্পরের প্রতি স্নেহ-শ্রদ্ধা ও গভীর ভালবাসার আরও কিছু উদাহরণ তাদের ভাষাতেই আমরা প্রকাশ করতে পারি।
ধূমকেতুর ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সালের সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে কাজী নজরুল ইসলামের ব্রিটিশ বিরোধী কবিতার জন্য ঐ সংখ্যাটি এবং তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘যুগবাণী’ ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। কবিকে করা হয় কারারুদ্ধ। ইংরেজ সরকারের বিচারে (১৬ জানুয়ারী, ১৯২৩) তাঁকে দেয়া হয় এক বছরের কারাদণ্ড। তিনি যখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি প্রকাশিত হয়। কবি গীতিনাট্যটি নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন (২২ জানুয়ারী, ১৯২৩)। উৎসর্গ পত্রে লেখেন,
শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাস

স্নেহভাজনেষু

নজরুলকে কবি বলে সম্বোধন কোন কোন রবীন্দ্র ভক্ত কবি-সাহিত্যিকের মনঃপূত হয় নি। কবিগুরু তাদের অভিযোগ খণ্ডন করেন এভাবে, ‘…যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে, তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’ নজরুলের কাব্য-প্রতিভার সাথে সঠিকভাবে পরিচিত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, ‘আমার বিশ্বাস তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করছে। আর পড়ে থাকলেও তারমধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করেন নি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছেন মাত্র।…কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না। এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও এই সুর বাজত।’ পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মাধ্যমে আলিপুর কারাগারে নজরুলের কাছে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি পাঠান কবিগুরু। নজরুলকে বলতে বলেন, ‘আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু প্রেরণা যোগাবার কবিও তো চাই।’ এ ঘটনা কারারুদ্ধ নজরুলকে প্রবল উচ্ছ্বসিত করে তোলে। তিনি রচনা করেন :

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে-
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগ্বগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

আলিপুর জেল থেকে কবি নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয় (১৪ এপ্রিল, ১৯২৩)। রাজবন্দীদের প্রতি জেল কর্মকর্তার অত্যাচারের বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। একটানা ৩৯ দিন অনশন চলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অনশন ভঙ্গের অনুরোধ জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান, , ‘Give up hunger strike, our literature claims you’ (অনশন ভঙ্গ করুন, আমাদের সাহিত্য আপনাকে দাবি করে।)
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ীতে ছিল অনেক বিদগ্ধজনের যাতায়াত। কবি গুরুর সান্নিধ্য লাভ করতে যেতেন তাঁরা। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের অনেকের মধ্যেই কেমন একটা সমীহভাবে বা আড়ষ্টতার ভাব দেখা যেতো। নজরুল ছিলেন একেবারে ব্যতিক্রম। প্রচণ্ড ঝড় তুলে তাঁর স্বভাবের বৈশিষ্ট্য অনুসারে গলা ছেড়ে গান গেয়ে ঠাকুর বাড়ীতে ছিল তাঁর আনাগোনা। আর তাঁর এই প্রবেশ বৈঠকখানা ছাড়িয়ে
বিস্তৃত ছিল কবিগুরুর শোবার ঘর পর্যন্ত। ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথেও নজরুলের খুবই ভাল সম্পর্ক ছিল। নজরুলের অগ্নিবীণা বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কবিগুরুর প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের শ্রদ্ধা-ভক্তির কথা আমরা কিছুটা আলোচনা করেছি। ১৯২৮ সালে নজরুল তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন সঞ্চিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেন। তিনি লেখেন,

বিশ্বকবি সম্রাট
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রী শ্রী চরণারবিন্দেষু

কবিগুরুর জন্মতিথিতে নজরুলের নিবেদন এবং তিরোধান দিবসে (৭ আগস্ট, ১৯৪১) শোকাহত নজরুলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কথা স্মরণ করে এ লেখার ইতি টানবো। রবির ‘জন্মতিথি’ কবিতায় নজরুল লিখেছেন :

রবির জন্মতিথি কয়জন জানে?
অঙ্ক কষিয়া পেয়েছে কি বিজ্ঞানে?
ধ্যানী যোগী দেখেছে কি? জ্ঞানী দেখিয়াছে?
ঠিকুজি আছে কি কোনো জ্যোতিষীর কাছে?
নাই- নাই! কত কোটি যুগ মহাব্যোমে
আলো অমৃত দিয়ে ধ্র“ব রবি ভ্রমে!
……
রবি শাশ্বত, তার নিত্য প্রকাশ
রূপ ধরি পৃথিবীতে ক্ষণিক বিলাস
করিয়া চলিয়া যায় জ্যোতির্লোকে,
এখনো দ্রষ্টা নেহারে তাঁর চোখে।
……
কবি হয়ে এল রবি এই বাঙলায়
দেখিল বুঝিল বলো কতজন তাঁয়?
রবি দেখে পেয়েছে যে আলোক প্রথম
তাঁরি মাঝে লভে রবি প্রথম জনম।
নিরক্ষর ও নিস্তেজ বাঙলায়
অক্ষর-জ্ঞান যদি সকলেই পায়,
অ-ক্ষয় অব্যয় রবি সেই দিন
সহস্র করে বাজাবেন তাঁর বীণ।
সেদিন নিত্য রবির জন্মতিথি
হইবে। মানুষ দিবে তাঁরে প্রেমপ্রীতি।

কবির মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল নজরুল লিখছেন :

দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত-পথের কোলে
শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে
উদাস গগনÑতলে,
বিশ্বের রবি, ভারতের কবি
শ্যাম বাঙলার হৃদয়ের ছবি
তুমি চলে যাবে বলে।
……
এত ভালোবাসিতে যে তুমি এ ভারতে ও বাঙলায়,
কোন্ অভিমানে তাঁদের আঁধারে ফেলে রেখে গেলে, হায়!
বল-দর্পীর মাথায় উপরে চরণ রাখিয়া আর
রক্ষা করিবে কে এই দুর্বলের সে অহঙ্কার?
হের, অরণ্য-কুন্তল এলাইয়া বাঙলা যে কাঁদে,
কৃষ্ণা-তিথির অঞ্চলে মুখ-লুকাইছে আজ চাঁদে!
শ্রাবণ মেঘের আড়াল টানিয়া গগনে কাঁদিছে রবি,
ঘরে ঘরে কাঁদে নরনারী, “ফিরে এস আমাদের কবি।”
……
শুনেছি, সূর্য নিভে গেলে হয় সৌরলোকের লয়;
বাঙলার রবি নিভে গেল আজ, আর কাহারও নয়।
……

নজরুল আরও লেখেন ‘সালাম অস্তরবি’ এবং ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে।’ ‘রবি-হারা’ কবিতাটি নজরুল ইসলামের কণ্ঠে কলকাতা বেতার (কলিকাতা-রেডিও) যোগে প্রচার করা হয়।
শিশুকালের সেই ভাবনা-অনুভূতি-স্বপ্নগুলো এভাবে ভিন্ন ধারায় ভিন্ন মাত্রায় জটিল থেকে জটিলতর আবর্তে যেন ঘুরপাক খেতে থাকে। অথচ আমাদের জীবন তো কাটতে পারে সুকান্ত-নজরুল-রবীন্দ্রনাথের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে মহীয়ান নব নব সৃষ্টির অমিয়ধারায় অবগাহন করে। আর সে প্রচেষ্টায় প্রতিনিয়ত নিয়োজিত থাকার তাগিদে সুকান্ত-নজরুল রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা দিয়ে গড়ে ওঠা আমার শিশু-কিশোর বয়সের মনটা নিয়ে নিজেকে, পরিবারকে, মানুষকে, সমাজকে, দেশকে, পৃথিবীকে, অনন্ত জীবনকে জানতে চাই, বুঝতে চাই, উপলব্ধি করতে চাই। সে অবস্থানের অবসান কোন ক্রমেই কাম্য নয়। তেমনটা ঘটলে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত দূরে সরে যাবে। তখন জীবনটা নিষ্ফলা হয়ে পড়বে। বেঁচে থাকা হবে অর্থহীন।