৮০তম জন্মবার্ষিকীতে প্রিয়জনের ভালোবাসায় সিক্ত সৈয়দ হাসান ইমাম

জন্মদিনে আপনজনদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গণের উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে এদেশের সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী সৈয়দ হাসান ইমাম-এর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়। গত ১২ শ্রাবণ, ১৪২২; ২৭ জুলাই, ২০১৫; সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত হয় উদযাপন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল দুই শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত ‘শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম-এর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ’। এই উদ্যাপন পর্ষদের আহবায়ক শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি কামাল লোহানী এবং সদস্য সচিব হলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই নটরাজের নৃত্যশিল্পীরা “আজ এই সুন্দর সন্ধ্যায় তুমি অতিথি বেশে এসেছো” গানের সাথে সমবেত নৃত্যের মাধ্যমে সৈয়দ হাসান ইমামকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যান। এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম-এর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদের সদস্য সচিব ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। এরপর সৈয়দ হাসান ইমামের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য ও শুভেচ্ছা নিবেদন করা হয়। তাঁকে উদ্দেশ্য করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক রচিত মানপত্র পাঠ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। মানপত্র পাঠ শেষে শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম-এর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ-এর আহবায়ক শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন পর্ব শুরু হয়। এ পর্বে উপস্থিত হয়ে দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ এই মহান ব্যক্তিত্বকে ঘিরে নিজেদের জীবনের নানা স্মরণীয় ঘটনা তুলে ধরে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক, চলচ্চিত্র, বেতারসহ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গণের বিভিন্ন মাধ্যমে অসামান্য অবদানের জন্য সৈয়দ হাসান ইমাম-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তারা তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেন। এ পর্বে বক্তব্য রাখেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী এবং সৈয়দ হাসান ইমামের সহধর্মিনী ও বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান। এছাড়াও, অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক পাঠানো হয়। শুভেচ্ছা জানানো হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান।

শুভেচ্ছা জ্ঞাপন শেষে সৈয়দ হাসান ইমামের ওপর রচিত ‘নীল ছোঁয়া কিংবদন্তী’ শিরোনামে একটি সম্মাননা গ্রন্থের মোড়ক উšে§াচন করা হয়। মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন সৈয়দ হাসান ইমাম। উক্ত গ্রন্থে তাঁর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত ব্যক্তিগণ। গ্রন্থটির সম্পাদনা পর্ষদে রয়েছেন মফিদুল হক, কাজী মদিনা, মোনায়েম সরকার, আবুল হাসনাত, মাহফুজা খানম, ড. মো. সামাদ, অশোক কর্মকার এবং মারুফ রসুল। সম্মাননা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন শেষে এই বরেণ্য শিল্পীর জীবন ও কর্মের নানান দিক নিয়ে প্রদর্শিত হয় একটি তথ্যচিত্র। এটি পরিচালনা করেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম-এর কন্যা ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম। অনুষ্ঠানে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন সালমা আকবর, ফকির আলমগীর ও মামুন জাহিদ খান। ছিল সম্মেলক সঙ্গীত। শিল্পীরা পরিবেশন করেন “আকাশ ভরা সূর্য তারা” গানটি। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আশরাফুল আলম, ডালিয়া আহমেদ ও মহিদুল ইসলাম।

সৈয়দ হাসান ইমাম বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির জগতে এক অনন্য কিংবদন্তী। চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা হিসেবে তিনি আমাদের সকলের মনে এক স্থায়ী শ্রদ্ধার আসনে আসীন। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব সময় থেকেই সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নানাভাবে কাজ করেছেন স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সংবাদ পাঠ করতেন সালেহ আহাম্মেদ নামে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তিনি পালন করেছেন মুখ্য ভূমিকা। বাংলাদেশের সকল প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সৈয়দ হাসান ইমাম এক অনমনীয়, সাহসী যোদ্ধার নাম।

Leave a Reply