Categories
প্রবন্ধ

ভাষার বহুমাত্রিক সংকট: মযহারুল ইসলাম বাবলা

বাংলাদেশ ভূখন্ড জুড়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাবাদে আমরা কেবল একটি ভাষাতেই কথা বলে থাকি। দ্বিতীয় বা বিকল্প অন্য কোন ভাষার প্রয়োজন হয় না। এটি যে আমাদের কত বিশাল প্রাপ্তি তা অনুভব করেছি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গিয়ে। হাতেগোনা দু’চারটি প্রদেশ ছাড়া ভারতের সবগুলো প্রদেশ ঘুরে দেখার ও জানার অভিজ্ঞতা হয়েছে। নানা কারণে অসংখ্যবার যেতে হয়েছিল ভারতে। ভারতের মানচিত্রকে ভাগ করে করে অনেক দফায় সম্পন্ন হয়েছিল বিশাল ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।
পশ্চিমবঙ্গের অনেকে আমাদের দেশজুড়ে মাত্র একটি ভাষা প্রচলনের জন্য আমাদের ভাগ্যবান মনে করেন। তাদের দেশে নয়, নিজেদের প্রদেশেই প্রাদেশিক বাংলা ভাষা অচল প্রায়। প্রদেশ জুড়ে প্রাদেশিক ভাষায় কথা বলার উপায় পর্যন্ত নেই। বিকল্প হিন্দির আশ্রয় নিতেই হয়। বাঙালিদের প্রদেশ পশ্চিমবাংলার রাজধানী কলকাতা নগরীতে বাংলাভাষি মানুষের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমে সংখ্যালঘুতে দাঁড়িয়েছে। কলকাতা নগরীও এখন বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি নির্ভর নয় মোটেও। হিন্দির আগ্রাসনে এবং বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের প্রভাবে কলকাতায় বাংলা ভাষায় ভাটির টান পড়েছে। ট্রামে, বাসে, রিকশায়, ট্যাক্সীতে, হাটে-বাজারে, রাস্তায়-ফুটপাতে, শপিংমলে, হোটেলে যেখানেই কথা বলার প্রয়োজন হয়, কথা বলতে হয় ইংরেজি বা হিন্দিতে, বাংলায় নয়। এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কলকাতার বাঙালিরা। দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দাদের সিংহভাগ বাঙালি হওয়ায় সেখানে বাংলা ভাষার প্রচলন রয়েছে। এছাড়া সেন্ট্রাল কলকাতাসহ পুরো কলকাতায় বাংলায় কথা বলার সুযোগ তেমন নেই বললে ভুল হবে না।
লক্ষ লক্ষ মানুষ ডেইলি প্যাসেঞ্জার হয়ে দূর দূরান্ত থেকে কলকাতায় আসা-যাওয়া করে। বনগাঁ, রানাঘাট, চুঁচড়া, বর্ধমান, হাওড়া, উত্তর-দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব-পশ্চিম মোদিনীপুর এমনকি খড়গপুর হতেও ট্রেনে-বাসে চেপে পেশাজীবী মানুষ কর্মস্থল কলকাতায় আসে এবং কাজ শেষে ফিরে যায় যে যার গন্তব্যে। ছুটির দিন ব্যতীত নিত্যই এ দৃশ্য দেখা যায়। শিয়ালদহ-হাওড়া-ধর্মতলার রেল ও বাস স্টেশনগুলোতে সকালে বিকেলের এ দৃশ্য নিত্যদিনের। কলকাতার স্থায়ী অনেক বাসিন্দা মাড়োয়ারি ব্যবসায়িদের কাছে উচ্চ মূল্য পেয়ে বসতভিটা বিক্রি করে নতুন আবাস গড়েছে শহরতলী ও মফস্বলে। কলকাতা শহরে বাঙালি সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার এটাও অন্যতম কারণ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কলকাতাকে এখন ভারতের বাংলা ভাষা সংস্কৃতির একমাত্র শহর বলার উপায় নেই। বহু ভাষাভাষি, বর্ণ, সম্প্রদায় ও জাতির শহর এখন কলকাতা। ভারতের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের আবাস হওয়ায় সেখানে গড়ে উঠেছে মাড়োয়ারি, পাঞ্জাবী, গুজরাটি ভাষাভাষিদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানে নিজ নিজ ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় তারা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। অথচ বাংলামাধ্যম স্কুলগুলো বন্ধ হবার পথে।
বিশাল ভারতে স্বীকৃত ভাষা প্রায় সাতাশটি। রাষ্ট্রীয় ভাষা হিন্দি হলেও রাষ্ট্রীয় ভাষার অবাধ প্রচলন কিন্তু সকল প্রদেশে নেই। এবং নেই বাধ্যবাধকতাও। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে তো নয়ই। দক্ষিণ ভারতের চার রাজ্যের মধ্যে একমাত্র অন্ধ্র প্রদেশের রাজধানী সিকান্দ্রাবাদ-হায়দরাবাদে হিন্দি-উর্দু ভাষার প্রচলন সামান্য দেখলেও অপর তিন রাজ্যের কোথাও রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রচলন দেখিনি। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশের গোড়া পত্তনে দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের অবদানের প্রচুর নজির রয়েছে। তেমন এক বিশ্বাসঘাতক হায়দরাবাদের নিজাম। যার বিশ্বাসঘাতকতায় এবং সহযোগিতায় ইংরেজদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল বীর টিপু সুলতানকে পরাজিত এবং হত্যা করাও। প্রতিদানে ইংরেজ শাসক নিজামকে পুরস্কৃত করেছিল হায়দরাবাদের শাসনকর্তা রূপে। ভারতের এ ধরনের অনেকগুলো করদরাজ্য ছিল। ব্রিটিশ অধীন করদরাজ্যগুলোর শাসন ক্ষমতা ছিল দেশীয় শাসকদের হাতে। ইংরেজ তাঁবেদার মুসলিম শাসক নিজামদের কারণেই হায়দরাবাদের তেলেগু ভাষার পাশাপাশি উর্দু ভাষার প্রচলন ছিল। সেই সুবাদে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের রাজধানী হায়দরাবাদেÑসিকান্দ্রাবাদে হিন্দি-উর্দু ভাষার প্রচলন এখনও রয়েছে। তবে রাজধানীর বাইরে গোটা প্রদেশজুড়ে তেলেগু ভাষাই বহুল প্রচলিত। কেরালা, কর্ণাটক, অন্ধ্র ও তামিলনাড়– দক্ষিণের এই চাররাজ্যে স্ব স্ব প্রাদেশিক ভাষা ও সংস্কৃতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিন্দির প্রবেশের সুযোগ-উপায় কোনটি নেই। ঐ চাররাজ্যের মালায়ালম, কানাড়া, তেলেগু এবং তামিল ভাষার একমাত্র বিকল্প ভাষাটি হচ্ছে ইংরেজি, রাষ্ট্রীয় ভাষা হিন্দি নয়। নিজ ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি দক্ষিণের চাররাজ্যের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাবোধ-ভালবাসা অভূতপূর্ব এবং শিক্ষণীয়ও বটে।
নিজেদের মাতৃভাষার দাবিতে লড়াই-সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগেও আমরা নিজ ভাষার প্রতি কি অতটা শ্রদ্ধাশীল হতে পেরেছি? আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু আমরা কি রাষ্ট্রভাষাকে সর্বস্তরে প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? পারি নি। সে ব্যর্থতার দায় দুঃখজনক হলেও আমাদের বহন করতে হচ্ছে। দক্ষিণ ভারতের ঐ চাররাজ্যের মানুষ রাষ্ট্রীয় ভাষা হিন্দিকে কেবল অগ্রহণ করে নি, সচেতনভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছে। হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতি রুখতে দ্বিতীয় বা বিকল্প ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে সানন্দে গ্রহণ করেছে। দক্ষিণ ভারতের ঐ চাররাজ্যের সাধারণ মানুষেরা পর্যন্ত অন্য ভাষাভাষি মানুষের সাথে বিকল্প ভাষা ইংরেজিতে অবলীলায় অনর্গল কথা বলে থাকে। চাররাজ্যের চার পৃথক ভাষা। কোনটির সঙ্গে কোনটির মিল নেই। মালায়ালম, কানাড়া, তেলেগু, তামিল এই চার ভাষাভাষির মানুষেরা পর্যন্ত একে অপরের সাথে যার যার মাতৃভাষায় নয়, কথা বলে বিকল্প ভাষা ইংরেজিতে। ভাষার প্রশ্নে কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। নিজ ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি অধিক আনুগত্যে হতবাক হয়েছিলাম।
তামিলনাড়– প্রদেশের পণ্ডিচেরী গিয়ে ফরাসী ভাষার প্রচলন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। ব্রিটিশদের থেকে ফরাসীরা পণ্ডিচেরী লীজ নিয়েছিল তাই পণ্ডিচেরীতে ফরাসীদের দীর্ঘ মেয়াদ ব্যাপী উপনিবেশ ছিল। সেখানকার তামিল ভাষি অনেককে ফরাসী ভাষা-সংস্কৃতিতে পারদর্শী পর্যন্ত দেখেছি। শুনেছি ফরাসী সরকার নাকি পণ্ডিচেরীর মানুষদের সুবিধা-অসুবিধা, দেখ-ভালের জন্যে এখনও সেখানে ফরাসী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। বর্তমান ভারতের একটি প্রদেশ গোয়া, যা পর্তুগীজদের ব্রিটিশরা লীজ দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার একবছর পর ভারতীয় বাহিনীকে পর্তুগীজদের সাথে যুদ্ধ করে গোয়াকে পর্তুগীজমুক্ত করে ভারতের একটি প্রদেশে পরিণত করতে হয়েছিল।
স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হয়েছিল কেন? এমন প্রশ্ন দক্ষিণের মানুষের কাছে করেছিলাম। তাদের উত্তর ছিল; স্বাধীন ভারতের ক্ষমতাসীন শাসকেরা হিন্দি ভাষি ছিলেন এবং কারও মতামতকে বিবেচনায় না নিয়ে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল। ভারতের সব অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায় উর্দু ভাষায় কথা না বললেও শিক্ষাক্রমে তাদের ভাষাটি উর্দু, হিন্দি নয়। সম্রাট আকবরের শাসনামলে সেনাবাহিনীর ফার্সি ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে কথোপকথনের প্রয়োজনে ফার্সি বর্ণমালা এবং হিন্দুস্থানী ভাষার মিশ্রণে উর্দিধারীদের জন্য যে ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল তা-ই উর্দু ভাষা। এই উর্দু ভাষা-নির্ভর শিক্ষাক্রমে যুক্ত ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়।
স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি ছিল প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত একদিন স্বাধীন হবে। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? তেমন প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনÑ“ভারতবর্ষের প্রদেশগুলোতে প্রাদেশিক ভাষার প্রচলন যেমন আছে ঠিক তেমনি থাকবে। তবে রাষ্ট্রভাষা হতে হবে ইংরেজি।” তিনি যে কত দূরদর্শী এবং অগ্রবর্তী চেতনা সমৃদ্ধ ছিলেন তাঁর এই মন্তব্যটি বর্তমান বাস্তবতায় এক অনন্য নজির। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রচলন ও ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা বা সরাসরি চাপ নেই বলেই প্রদেশগুলো প্রাদেশিক ভাষার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছে। সেক্ষেত্রে ভারতের প্রদেশগুলোতে প্রাদেশিক ভাষা রক্ষা-প্রচলন এবং ব্যবহারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব প্রদেশগুলোর হলেও বাস্তবক্ষেত্রে তা নানা কারণে সম্ভব হচ্ছে না। যেমনটি পশ্চিমবঙ্গে। কেননা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বাংলাভাষিরা ইতিমধ্যে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া রয়েছে সর্বভারতীয় প্রচার-প্রতিষ্ঠার হাতছানি। খ্যাতিবান বাঙালি গায়ক, সুরকার, কাহিনীকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক হতে অনেক গুণী শিল্পী-কুশলীরা সর্বভারতীয় প্রচারÑপ্রতিষ্ঠার মোহে কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই পাড়ি দিয়ে বাংলা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যহানিতে অবদান রেখেছেন। বাংলা সাংস্কৃতির ক্ষতিসাধন সেখান থেকেই শুরু। অথচ কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্র, বাংলা গান উপমহাদেশ জুড়ে অতীতে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছিল। আজকে বাংলা চলচ্চিত্রের যৎসামান্য সৃজনশীল চলচ্চিত্র ছাড়া সিংহভাগ বাংলা ছবিই হিন্দি রিমেক। অথচ এক সময় বাংলা চলচ্চিত্রের রিমেক এবং বাংলা কথাসাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক পড়েছিল ভারতজুড়ে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে পরনির্ভরতার প্রবণতায় ঐতিহ্যপূর্ণ বাংলা চলচ্চিত্র, বাংলা গান মোটেও মর্যাদার আসনে নেই। বাঙালি দর্শক-শ্রোতা পর্যন্ত অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে অপসংস্কৃতির দাঙ্গাবাজি-অশ্লীল কুরুচীপূর্ণ হিন্দি নাচে-গানে। এতে করে মুনাফাবাজ চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মওকার সকল সুযোগ। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির এই অপরিসীম ক্ষতির বিষয় বিবেচনা না করার খেসারত তাদেরই দিতে হচ্ছে চড়ামূল্যে। কলকাতার বাংলা টিভি চ্যানেলগুলো পর্যন্ত হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত নয়, হিন্দির ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে হিন্দি অনুষ্ঠানের রিমেক। অথচ সমৃদ্ধ বাংলা সংস্কৃতিকে দিয়ে নয়, হিন্দির অনুকরণে হিন্দি চ্যানেলের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে এনেছে। শুরুতে কিংবন্তি মান্না দে বাংলা গান পরিত্যাগ করে হিন্দি গানের সর্বভারতীয় গায়ক হবার অভিলাষে বোম্বে স্থায়ী হয়েছিলেন। শেষ বয়সে এসে তাঁকেও বলতে হয়েছেএকমাত্র বাঙালি হবার কারণেই তাঁর হিন্দি উচ্চারণ মোহাম্মদ রফি-মুকেশদের ন্যায় হতে পারেনি। স্বীকার করে অকপটে বলেছেনও ‘হিন্দি গানের ভুবনে আই ওয়াজ অ্যান আউটসাইডার।’ ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় মাত্র ক’বছর পূর্বে আক্ষেপে বলেছেন-কেবল হিন্দিভাষি না হবার কারণেই সকল যোগ্যতা সত্ত্বেও কংগ্রেস দলের এবং সরকারের শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেন নি।
দক্ষিণ ভারতের চাররাজ্যে হিন্দি চলচ্চিত্র-হিন্দি সংস্কৃতির আগ্রাসন তারা রুখেছে নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতির অধিকতর চর্চার মধ্য দিয়ে। নিজ ভাষার চলচ্চিত্র তাদের কাছে অধিক সমাদৃত বলেই হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র সেখানে বিস্তারের সুযোগ পায়নি। দক্ষিণের গায়ক-অভিনেতা-অভিনেত্রী অনেকে হিন্দি ছবিতে গান এবং অভিনয় করলেও মুম্বাইয়ে চিরস্থায়ী হয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেন নি। তামিল গায়ক বালা সুব্রামনিয়াম দক্ষিণে এত জনপ্রিয় ও সমাদৃত যে তাঁকে রিটার্ন টিকেট দিয়ে মুম্বাই বা অন্য কোথাও গান গাইতে নিতে হয়। প্রচুর হিন্দি গান গেয়ে সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা পেলেও, তিনি মোহে পড়ে চেন্নাই ছেড়ে মুম্বাইয়ে স্থায়ী হন নি। অথচ বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্যপূর্ণ কলকাতার এমন দুর্দশা দেখে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এক সময়ে কলকাতায় নির্মিত বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের দাপুটে অবাঙালি অভিনেতা-গায়ক কে.এল. সায়গলের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে সমালোচনা এবং কটূক্তি করেছিলেন চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। অবাঙালি সায়গলের অশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে বাংলা ভাষার ক্ষতির কথাও বলেছেন। হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র নির্মাণের সকল অনুরোধ-আবেদন সযতেœ প্রত্যাখ্যান করে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, যে ভাষা ভালভাবে বলতে ও বুঝতে সক্ষম নন, সে ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ তাঁর পক্ষে অসম্ভব। অথচ এই সত্যজিৎ রায়কে পর্যন্ত এক পর্যায়ে ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ী’ নামক হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হয়েছিল। যার পেছনে ইচ্ছের চেয়েও অধিক লোভনীয় অন্য কারণ অবশ্যই ছিল। এই বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় যথার্থই বলেছিলেনÑ“বাংলা ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির লালন পালন পশ্চিমবাংলা কেন্দ্রীক থাকবে না। তা বাংলাদেশ কেন্দ্রীকই হবে।” তাঁর সেই মন্তব্যের বাস্তবতা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভারতের সর্ববৃহৎ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইয়ে। মুম্বাই চলচ্চিত্র শিল্পের বিশালতার তুলনায় মাদ্রাজ-কলকাতা অনেক ক্ষুদ্র পরিসরে। মুম্বাই নির্মিত হিন্দি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র যেমন সর্বভারতীয় চাহিদা পূরণ করছে, পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক প্রসারও লাভ করেছে। হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র এবং সর্ববৃহৎ ইন্ডাস্ট্রি মুম্বাই অথচ মুম্বাই হিন্দি বলয়ের কোন প্রদেশ নয়। মহারাষ্ট্র রাজ্যের রাজধানী মুম্বাই। প্রদেশের প্রাদেশিক ভাষা মারাঠি। তবে হিন্দির আগ্রাসনে মারাঠি ভাষা আজ কোণঠাসা অবস্থায়। মারাঠি ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারাটি সচল ও সক্রিয় থাকলেও হিন্দির আগ্রাসনে-প্রভাবে অনেকটা ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। মারাঠিদের রাজধানী বন্দরনগরী মুম্বাইয়ে মারাঠিরা সংখ্যালঘু। ভারতের প্রায় সকল প্রদেশের মানুষকেই মুম্বাইয়ে দেখা যায়। সংখ্যায় যারা মারাঠিদের তুলনায় বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুম্বাইয়ে হিন্দি ভাষার ব্যাপক প্রচলন থাকলেও মহারাষ্ট্র রাজ্য জুড়ে মারাঠি ভাষার প্রচলন কিন্তু রয়েছে। মারাঠিরা হিন্দি ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতীয়দের ন্যায় কট্টর নয়। অপর ভাষাভাষিদের সঙ্গে বিকল্প ভাষা হিসেবে রাষ্ট্রভাষা হিন্দিতেই কথা বলে থাকে। মুম্বাই নগরীও কলকাতার ন্যায় সর্বভারতীয় মানুষের আবাসস্থল। নানা জাতি-সম্প্রদায়ের শ্রেণী-পেশার মানুষে ঠাসা। সেখানে মারাঠিদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা কঠিন। তবু মারাঠি ভাষার নাটক, সাহিত্য-সংস্কৃতি মারাঠিরা পরিত্যাগ করে পুরো মাত্রায় হিন্দিমুখী হয়নি বলেই মারাঠি ভাষার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল স্বকীয়তায় টিকে আছে আজো। তবে প্রতিনিয়ত তাদের হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে।
১৯৮৮ সালে কলকাতার নাট্যদল ‘নান্দীকারে’র আমন্ত্রণে নাট্য উৎসবে অংশ নিতে ঢাকা থিয়েটারের সবাই কলকাতা গিয়েছিলাম। নাট্য উৎসবটি হয়েছিল রবীন্দ্রসদনে। বাংলা ভাষা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন ভাষার নাটকও উৎসবে অংশ নিয়েছিল। সে উৎসবেই উৎপল দত্তের অভিনীত, লিখিত ও নির্দেশিত নাটক ‘টিনের তলোয়ার’ দেখার সুযোগ হয়েছিল। নাটক শেষে অতিউৎসাহী আমি দৌড়ে গ্রীনরুমে গিয়ে বাস্তবের উৎপল দত্তকে দেখে অবাক হয়ে যাই। কিছুতেই মেলানো সম্ভব হচ্ছিল না। মাত্র একটু আগে যে মানুষটি যুবকের মতো মঞ্চ কাঁপিয়ে এলেন তিনি বয়সের ভারে নত। এই বয়সে এমন অভিনয় তাঁর পক্ষেই ছিল সম্ভব। ঢাকা থিয়েটারের ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকটির প্রদর্শনীর দিনে রবীন্দ্রসদন ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ । অথচ নাটক শেষে দর্শকদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ লক্ষ্য করে কারণ জানতে চাইলে তাঁরা যা বলেন তা শুনে রীতিমতো আঁৎকে উঠি। ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকের পূর্ববঙ্গীয় গ্রামীণ সংলাপ তাঁদের নাকি বিন্দুমাত্র বোধগম্য হয় নি। এজন্যই তাদের ক্ষোভ ও হতাশা। ‘নান্দীকার’-প্রধান রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত আক্ষেপে-শ্লেষে আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেনÑ“হিন্দি ভাষার দৌরাত্ম্যে কলকাতার বাঙালিদের এই দশা। হিন্দি শুনতে শুনতে তাদের কান নষ্ট হয়ে গেছে। হিন্দি বলতে বলতে বাংলা ভাষা পর্যন্ত ভুলতে বসেছে। সেখানে পূর্ববঙ্গীয় বাংলা ভাষার কেরামত মঙ্গল নাটকের সংলাপ তাদের বোধগম্য হবার উপায় কোথায়?”
ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল বাঙালির শহর কলকাতা। কলকাতাকে শাসক ইংরেজ সাজিয়েছিল লন্ডনের সাজে। কলকাতা হয়ে উঠেছিল প্রাচ্যের লন্ডন। কলকাতাকে কেন্দ্র করেই উপমহাদেশ জুড়ে গড়ে তুলেছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য। ‘ভাগ কর এবং শোষণ কর’ নীতিতে বঙ্গভঙ্গের কূটচাল চেলেছিল চতুর ইংরেজ। সেই স্বপ্নের মোহভঙ্গে ক্ষুব্ধ ইংরেজ কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লি সরিয়ে নেবার পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। ভারতবর্ষের অপরাপর জাতিসত্তার চেয়ে বাঙালিরা চিন্তা, কর্মে, মননে, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চাসহ রাজনীতিতেও ছিল অগ্রবর্তী। সেই বাঙালি সংস্কৃতির কলকাতা এখন অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য হারিয়ে বিপন্নপ্রায়। কলকাতার বাংলা ভাষার সাহিত্য এখনও মাথা উঁচু করে আছে দুই বাংলার পাঠকের কারণে। বাংলা ভাষা ছেড়ে বাংলা সাহিত্যিকেরা মুম্বাই ছোটে নি বা সাহিত্যিক ভাষার কারণে ছুটে যাবার উপায় নেই বলে এখনো বাংলা সাহিত্য সৃষ্টিতে কলকাতার সাহিত্যিকেরা অবদান রেখে যাচ্ছেন। তবে বাংলা ভাষার পাঠক কিন্তু নিয়মিতভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশে যেমন পশ্চিমবঙ্গেও তেমনি। আমাদের দেশে প্রকাশনা শিল্পে উৎকর্ষ সাধনসহ প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, তবে মোটা দাগের চটুল ও হালকা সেন্টিমেন্টের মাত্র ক’জন লেখকের বইই বাজারমাত করছে। সৃজনশীল গবেষণা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পন্ন লেখকের বই কিন্তু সে তুলনায় পাঠক প্রিয়তা লাভে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের তরুণদের মাঝে বিশেষ বিশেষ লেখকের চটুল বই কেনা এবং পড়া ফ্যাশনে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় বই পড়ার পাঠক বাড়ে নি বরং আনুপাতিক হারে কমেছে। নতুন প্রজন্মের খুব কম সংখ্যকই বই পড়ে। বেশির ভাগই কম্পিউটার, ইন্টারনেট আর আকাশ সংস্কৃতির জ্বরে আক্রান্ত। পাঠকপ্রিয়তা লাভেই বইয়ের গুণাবলী বিবেচিত হয় না। বইয়ের দার্শনিকতা ও ইতিহাস নির্ভরতাই ভালো বইয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি। সে সমস্ত গুণাবলী সমৃদ্ধ বই পাঠকপ্রিয়তা না পাবার মূলে রয়েছে আমাদের বিকলাঙ্গ চিন্তা-চেতনা সর্বোপরি রুগ্ন মানসিকতার তৎপরতা।
পশ্চিমবঙ্গের জেলা ও মফস্বলে বসবাসরত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে সত্য, তবে সেখানেও হিন্দির আগ্রাসন ঢুকে পড়েছে। হিন্দি ছবি-সিরিয়াল, হিন্দি গানের ভক্তের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে বাংলা ভাষার ছবি, গান, সাহিত্য প্রীতি ক্রমশঃ পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ত্রিশ বছর আগে পশ্চিমবাংলার ২৪ পরগনা, হাওড়া, বর্ধমান, মোদিনীপুর, প্রভৃতি জেলায় শারদীয় পূজায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। বারোয়ারী পূজা মণ্ডপের মাইকগুলোতে হেমন্ত, সতীনাথ, শ্যামল, শচীন, মানবেন্দ্র, মান্না দে, তালাত মাহমুদ, সলিল চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র, সন্ধ্যা, ভূপেন, সাগর সেন, দেবব্রত প্রমুখ বাংলা গানের কিংবদন্তি গায়ক-গায়িকাদের জনপ্রিয় গান দিন-রাত বাজতে শুনেছি-দেখেছি। অন্য ভাষার গান বাজতে শুনি নি, দেখি নি। অথচ মাত্র ক’বছর পূর্বে শারদীয় পূজায় ঐ সমস্ত স্থানে গিয়ে দেখি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। দেখি বারোয়ারী পূজা মণ্ডপে দিন-রাত মাইকে গান বাজছে, তবে বাংলা গান নয়, হিন্দি ছবির জনপ্রিয় গানগুলো, যেগুলোর বাদ্য-বাজনার আধিক্যে গানের কথা বোঝার সামান্য উপায় থাকে না।
কলকাতার সুবিধালোভী মধ্যবিত্ত বাঙালি যেমন সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠার পিছু ছুটতে গিয়ে বাংলা ভাষাকে পরিত্যাগ করে ইংরেজি-হিন্দি নির্ভর হয়ে উঠেছে, একইভাবে আমাদের দেশেও বিত্তবান এবং মধ্যবিত্তরা আর্থিক প্রতিষ্ঠার মোহে বাংলা ভাষার পাঠ্যক্রম পরিহারে ইংরেজি মাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ভারতের প্রাদেশিক ভাষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রভাব বা চাপ যে নেই তা যেমন বলা যাবে না; তেমনিও বলা যাবে না রাজ্য সরকারগুলোর সীমাবদ্ধতার কথাও। আমাদের ক্ষেত্রে তো তেমন আশঙ্কা নেই। তবে আমরা কেন ঐ একই পথে এগোচ্ছি? আমাদের অভিজাত শ্রেণী গণসমষ্টির বাইরে বিচ্ছিন্ন পৃথক এক জগৎ গড়ে তুলেছে। যার সাথে গণসমষ্টির কোন যোগসূত্রতা নেই। নেই কোন মিলও। অভিজাতরা তাদের নিজস্ব সুযোগ-সুবিধার মসৃণ জগৎটি গড়ে তুলেছে। অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবিধাবঞ্চিত গণ-মানুষেরা এই সুবিধাভোগীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্রের যত সুবিধা একচেটিয়া অভিজাতরাই ভোগ করে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাও তাদেরই হাতে। সমষ্টিগত মানুষ অধিকার এবং সুবিধা বঞ্চিত অতিসাধারণ এবং নিম্নমানের জীবনযাপন করলেও রাষ্ট্র ও শাসক শ্রেণী তাদের পক্ষে কখনো ছিল না এবং আজো নেই। আজকে আমাদের রাষ্ট্রভাষাও অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদী আকাক্সক্ষা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির রক্ষায় নানা কর্মকাণ্ডে যারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাÑভালবাসা অর্জন করেছেন। তাঁদের অনেকেই মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষা মুক্ত নন। তাঁদের সন্তানেরা ইংরেজি মাধ্যমে এবং বিদেশে পড়াশোনা করছে। স্ববিরোধিতার রোগে আক্রান্ত এ সমস্ত বরেণ্য ব্যক্তিরা নিজেরা প্রচার মাধ্যমে যা বলেন নিজের ঘরে সেটা বিন্দুমাত্র পালন করেন না। বিকারগ্রস্ত মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষায় পরিপূর্ণ এই সকল ব্যক্তিবর্গ কার্যত অদ্ভুত প্রতারণায় নিজেদেরকে যুক্ত করে দেশবাসীকে স্বাবিরোধী জ্ঞানদান করে যাচ্ছেন।
বিশ্বায়নের বিরূপ প্রভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা-বৈচিত্র এখন হুমকির কবলে। এর থেকে রক্ষা পেতে প্রত্যেক জাতিকে তার ভাষা-সংস্কৃতির রক্ষায় ভূমিকা পালন করতে হবে। ভাষা বৈচিত্রের পৃথিবীতে বৈচিত্র থাকাটা আবশ্যক এবং জরুরিও। সমস্ত জাতিসত্তার ভাষা-সংস্কৃতি টিকে না থাকলে পৃথিবী বৈচিত্রহীন হয়ে যাবে। যা মোটেই কাক্সিক্ষত হতে পারে না।
ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি। তাই হিন্দির প্রভাব ভারতজুড়ে থাকবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রশ্নটা হলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি পশ্চিমবঙ্গের মতো হিন্দির আগ্রাসন ঘটেনি? আকাশ সংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশেও ঘরে ঘরে হিন্দি ছবি-সিরিয়াল হতে হিন্দি অনুষ্ঠান দেখার আধিক্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। হিন্দি ছবি-সিরিয়ালে আসক্ত শতকরা আশিভাগ টিভি দর্শক। আমাদের সংস্কৃতিতেও মারত্মক আকারে হিন্দির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বেসরকারি টিভিগুলোতে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। হিন্দি স্টেজ অনুষ্ঠানের আদলে এবং হিন্দি গানের প্রতিযোগিতার অনুকরণে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে চলছে একই ধারা। তবে ভাষা এখনো বাংলা এই যা ভরসা। তবু এগুলো অবশ্যই হিন্দির রিমেক ছাড়া অন্য কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যবরণ আমরা হয়ত করবো না। তবে হিন্দির এই আগ্রাসনে আমাদের সংস্কৃতিতে-রুচিতে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে তা উদ্বেগজনক। আমাদের সমাজে হিন্দি সংস্কৃতির উগ্র প্রভাব বৃদ্ধির নমুনা আমরা নিয়মিতই দেখছি। পাকিস্তানি শাসকেরা দুই যুগব্যাপী আমাদেরকে উর্দুভাষি করার প্রবল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ আজকে বাংলাদেশের শিশু-কিশোর হতে সকল বয়সী মানুষের মধ্যে হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাব-প্রচলন নানাভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
সম্প্রদায়গত অভিন্নতা সত্ত্বেও ইরাক এবং তুরস্কের সংখ্যালঘু কুর্দি ভাষিদের ‘কুর্দিস্থান’ পৃথক রাষ্ট্রের দাবির মূলে রয়েছে কুর্দি ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার কুর্দি জাতীয়তাবাদী তাগিদ। দেশ দু’টির সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবি এবং তুর্কি ভাষিদের নিষ্ঠুর দমন-পীড়নেও কুর্দি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রাম দমন করা সম্ভব হয় নি। বরং স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি স্বাধীন পৃথক ‘কুর্দিস্থান’ রাষ্ট্রের দাবিতে পরিণত হয়েছে, যা সশস্ত্র রূপ পর্যন্ত ধারণ করেছে। সম্প্রদায়গত অভিন্নতা কেবল ভাষার কারণে চরম বিভেদ-সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।
ফার্সি জাতিসত্তার ইরানের সঙ্গে আরবদের সম্প্রদায়গত মিলও জাতিগত অমিলের কারণে বৈরিতায় পরিণত। আরবদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও পারস্য নিজেদের অধিক সমৃদ্ধ ফার্সি ভাষা-সংস্কৃতি ত্যাগ করে আরবি গ্রহণ করে নি। আরব ও ফার্সিদের জাতিগত বিরোধ-বিদ্বেষ সুদূর অতীতের ন্যায় আজও টিকে আছে। নানাভাবে এই বিরোধ বিদ্বেষের প্রতিফলন দেখা যায়। মুসলিম আরব রাষ্ট্রসমূহের আরব লীগে নিকট প্রতিবেশী ইরানকে অন্তর্ভুক্ত না করার মূল কারণটি জাতিগত ভিন্নতা। সম্প্রদায়গত অভিন্নতার চেয়েও জাতিগত ভিন্নতা আরবি-ফার্সি বিভাজনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিস্ময় এই যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানি হানাদার পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদ্গারের বিরূপ প্রভাব পড়েছিল ভারতীয় শিখ ধর্মাবলম্বী পাঞ্জাবীদের ওপর। বিক্ষুব্ধ ভারতীয় পাঞ্জাবীদের প্রতিবাদের মুখে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার বন্ধ হবার উপক্রম হয়। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছিল। পাকিস্তানি এবং ভারতীয় পাঞ্জাবীদের সম্প্রদায়গত ভিন্নতা হার মেনেছিল তাদের জাতিসত্তার কাছে। মানুষ তার সবকিছু পাল্টাতে পারলেও জাতিসত্তাকে পাল্টাতে পারে না। যে কেউ তাৎক্ষণিক হিন্দু থেকে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ থেকে মুসলিম, ইহুদি থেকে শিখ ধর্মাবলম্বী হতে সক্ষম হলেও, তার জাতিসত্তা কখনো পাল্টাতে পারে না। একজন বাঙালি বিলেতে পঞ্চাশ বছর বসবাস করে ইংরেজের সমস্ত কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ অভ্যস্ত এবং পারদর্শী হলেও তার পক্ষে ইংরেজ হওয়া অসম্ভব। একই ভাবে যে কোন জাতিসত্তার কেউ অন্য জাতিসত্তায় পরিণত হতে পারবে না। আর জাতিসত্তার ভিত্তিমূলেই ভাষা।
একমাত্র ভাষা নির্ভর নির্ভেজাল এবং যথার্থ জাতীয়তাবাদী চেতনাই পারে গণতন্ত্রকে বিকশিত করে সকল মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য তৈরি করতে। তেমন প্রত্যাশা পূরণ আমাদের ক্ষেত্রে হয় নি। বারবার তা ব্যাহত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের যে সাংস্কৃতিক উন্মেষ ঘটেছিল তাও বারবার পথ হারিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনার ধারাবাহিকতায় স্বাধিকার আন্দোলন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ভাষার দাবিটিই মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত করেছিল। স্বাধীনতার পর সেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলেও রাষ্ট্রভাষার সর্বজনীন প্রচলন ঘটে নি। বরং বৈষম্যের শিকার হয়ে বাংলা ভাষা সাধারণের ভাষায় পরিণত। অপরদিকে বিত্তবান ও মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে শিক্ষা-দীক্ষা এবং ভাষা-সংস্কৃতিতে বাংলার পরিবর্তে স্থান পেয়েছে হাওলাতি বিদেশি ভাষা। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। সমষ্টিগত উন্নতির বিষয়টিকে কেউ বিবেচনায় আনছে না। এই আত্মকেন্দ্রিকতার অবসান এবং সমষ্টিগত মানুষের সার্বিক মুক্তির মধ্য দিয়েই সমষ্টিগত মানুষের ভাষা-সংস্কৃতি সর্বজনীন হতে পারবে। অন্য কোন বিকল্প পথ-উপায় কিন্তু নেই। **