Categories
সংবাদ

গণসঙ্গীতের প্রতিবাদী সুর আর উচ্ছ্বাসে চলছে উদীচী’র গণসঙ্গীত উৎসব

Gonosongeet Utsob_2nd Dayগণসঙ্গীতের প্রতিবাদী সুর, উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা ও অসুর বিনাশী সুর সবখানে ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে চলছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত “সত্যেন সেন গণসঙ্গীত উৎসব ও জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতা’২০১৪”। ২৯ মার্চ শনিবার ছিল উৎসবের দ্বিতীয় দিন। এ দিন বিকাল সাড়ে ৫টায় শুরু হয় আলোচনা সভা। উদীচী’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উৎসব প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক ও উদীচী’র সহ-সভাপতি শংকর সাঁওজাল এবং উদীচী’র সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার। আলোচনা সভায় উদীচী’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সাবেক সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ ইদু, উৎসবের আমন্ত্রিত অতিথি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত গবেষক ও শিল্পী শুভেন্দু মাইতি, উদীচী’র সহ-সভাপতি মাহমুদ সেলিম, কাজী মোহাম্মদ শীশ এবং উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য সিদ্দিক মোল্লা অংশ নেন। আলোচনা সভায় বক্তারা গণমানুষকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সজাগ করতে ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে গণসঙ্গীতের অপরিসীম ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন গণআন্দোলনে জনগণকে আন্দোলিত করতে গণসঙ্গীত বিশেষভাবে অবদান রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।

আলোচনা সভার পর চারণ শিল্পী ও উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের অন্যতম সদস্য সিদ্দিক মোল্লার গানের সিডি “গরীব দুঃখীর আপন কেহ নাই”-এর মোড়ক উন্মোচন করেন গোলাম মোহাম্মদ ইদু ও শুভেন্দু মাইতি। উদীচী’র সাথে সম্পৃক্ত থেকে দীর্ঘদিন ধরে গণমানুষের সুখ-দুঃখের গান পরিবেশন করে আসছেন রণাঙ্গণের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক মোল্লা। সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের এ প্রতিনিধি সবসময়ই উদীচী’র আদর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে একটি শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে লড়াই করে যাচ্ছেন। সিডির মোট ১৩টি গানের মধ্যে ১১টিরই কথা ও সুর দিয়েছেন সিদ্দিক মোল্লা। বাকি দু’টি গানের মধ্যে একটির রচয়িতা উদীচী’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সত্যেন সেন এবং অন্যটির রচয়িতা উদীচী’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাহমুদ সেলিম।

Gonosongeet Utsob_2nd Day 02সিদ্দিক মোল্লার গানের সিডির মোড়ক উন্মোচনের পর সত্যেন সেন জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতার জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে সনদপত্র ও ক্রেস্ট তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানমালার দ্বিতীয় পর্বে একক গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন আমন্ত্রিত অতিথি শিল্পী শুভেন্দু মাইতি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, কফিল আহমেদ, নিবেদিতা তপু ও কৃষ্ণকলি। এছাড়াও, দলীয় গণসঙ্গীত পরিবেশন করে উদীচী কাফরুল শাখা, বহ্নিশিখা ও সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন। উৎসবের তৃতীয় ও শেষ দিন ৩০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অতিথি শিল্পী শুভেন্দু মাইতি’র একক সংগীত সন্ধ্যা আয়োজিত হবে।

এর আগে, উৎসবের প্রথম দিন ২৮ মার্চ শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট গণসঙ্গীত শিল্পী কামরুদ্দিন আবসার। এসময় উদীচী’র শিল্পীদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন উৎসবের উদ্বোধক কামরুদ্দিন আবসার এবং উদীচী’র পতাকা উত্তোলন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কামাল লোহানী। উদ্বোধনের আগে সকাল ১০টা থেকে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় পর্যায়ের গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতা। জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে দেশের আটটি বিভাগীয় পর্যায়ের (ঢাকা পূর্ব ও পশ্চিমসহ) প্রতিযোগিতায় ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’Ñ এই তিনটি বিভাগের প্রথম তিনটি স্থানাধিকারীরা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় ‘ক’ বিভাগে যুগ্মভাবে প্রথম হন শাহরিয়ার অভিক অতনু ও অর্ণব কান্তি সিংহ, দ্বিতীয় হন মীর মোবাশ্বিরা ইবনাত নদী, তৃতীয় স্থান পায় জিহাদ খান। ‘খ’ বিভাগে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন বিপ্লব রায়হান। যুগ্মভাবে দ্বিতীয় হন আশরাফুল আলম এবং মানিক মোহন চন্দ। আর তৃতীয় হন নুশিন আদিবা ও জ্যোতিষ চন্দ্র বর্মণ। ‘গ’ অর্থাৎ দলীয় বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে উদীচী যশোর জেলা সংসদ। যৌথভাবে দ্বিতীয় হয় উদীচী চট্টগ্রাম, নওগাঁ এবং সিলেট জেলা সংসদ। তৃতীয় স্থান অর্জন করে তিনটি দল। এরা হলো- রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ, সাউন্ড টাচ রংপুর এবং অগ্নিবীণা শিল্পকলা বিদ্যালয়।

দেশের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গণসঙ্গীতকে ছড়িয়ে দেয়া এবং গণসঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে উদীচী’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সত্যেন সেনের জন্মদিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ২৮ ও ২৯ মার্চ “সত্যেন সেন গণসঙ্গীত উৎসব ও জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতা” আয়োজন করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বৈরতন্ত্র, শ্রমজীবীর বিরুদ্ধে শোষক, অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা, সত্যের বিরুদ্ধে অসত্য সর্বোপরি শুভ ও সুরের বিরুদ্ধে অশুভ ও অসুরের শক্তি দাপট চালিয়ে যাচ্ছে। আর তাই, অশুভ আর অসুর শক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে উদীচী’র এবারের গণসঙ্গীত উৎসবের শ্লোগান হলোÑ “অসুর বিনাশী সুরের আগুন, ছড়িয়ে দাও সবখানে”।